ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও আশপাশের অঞ্চলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো তীব্র ড্রোন হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। এতে বহু আবাসিক ভবন ও গুদামঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়ার অভ্যন্তরেও পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন, যার ফলে সীমান্ত থেকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি রুশ তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে।
কিয়েভ অঞ্চলের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেনকো জানিয়েছেন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলায় ১৪টি গুদাম, ১৬টি ব্যক্তিগত বাড়ি, ৩টি বহুতল আবাসিক ভবন এবং ১৬টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর সেখানে দ্বিতীয় আরেকটি ড্রোন আঘাত হানে। সামরিক পরিভাষায় একে 'ডাবল ট্যাপ' হামলা বলা হয়, যা মূলত প্রথম উদ্ধারকারী দলগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়। এই হামলায় একজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা কিয়েভ অঞ্চলের এমন একটি গুদামে আঘাত হেনেছে যেখানে ইউক্রেনের 'ফ্ল্যামিঙ্গো' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেটের জ্বালানি মজুত ছিল। তবে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি নিশ্চিত করেননি এবং স্বাধীনভাবে এটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি কিয়েভ ও এর আশপাশের অঞ্চলে বই, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য মজুত রাখার বেশ কয়েকটি বেসামরিক গুদাম রুশ হামলায় ধ্বংস হয়েছে।
ইউক্রেনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিফেন্স কাউন্সিলের অধীনস্থ সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিসইনফরমেশনের প্রধান আন্দ্রি কোভালেনকো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষকে ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত করার লক্ষ্যেই রাশিয়া ঝাঁকে ঝাঁকে দ্রুতগতির জেট-চালিত ড্রোন ছুড়ছে। উপর্যুপরি হামলার কারণে কিয়েভের বাতাস দূষিত হয়ে পড়েছে এবং বাসিন্দাদের ঘরের জানালা বন্ধ রাখার পাশাপাশি বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর আগের দিন ১৫ ঘণ্টা ধরে চলা বিমান হামলার সতর্কতায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল রাজধানী কিয়েভ।
এদিকে, শীতকালকে 'অস্ত্র' হিসেবে ব্যবহার করতে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ রুশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানকার সামরিক প্রধান ওলেক্সান্ডার প্রোকুদিন সতর্ক করে বলেছেন, আসন্ন শীতে এই অঞ্চল দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ও তাপহীন থাকতে পারে। গত জুলাই থেকে এ পর্যন্ত খেরসনে ১৭০টি গ্লাইড বোমা এবং গত দুই মাসে ১,৭০০-এর বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহেই ছোট ড্রোনের হামলা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬,৫০০-এ। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
টানা যুদ্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটির অর্থনীতি মন্ত্রী ওলেক্সান্ডার ক্রাভচেঙ্কো জানিয়েছেন, কৃষ্ণসাগর বন্দর দিয়ে শস্য রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় ২০২৬ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১.৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে। ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতভর ইউক্রেন লক্ষ্য করে ১৬৪টি ড্রোন ছুড়ছে। এছাড়া সুমি অঞ্চলে রুশ গ্লাইড বোমা হামলায় ৬১ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ নিহত এবং সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার সামরিক প্রধান ওলেহ হ্রিহোরভ।
ইউক্রেনীয় বাহিনীও রাশিয়ার অভ্যন্তরে তাদের ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইউক্রেনের জেনারেল স্টাফ নিশ্চিত করেছে যে, সীমান্ত থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে ইয়ারোস্লাভল অঞ্চলের 'স্লাভনেফট-ইয়ানোস' (Slavneft-YANOS) তেল শোধনাগারে সফল ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে, যা সেখানে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। এই শোধনাগারটি পেট্রোল, ডিজেল, বিমান জ্বালানি ও লুব্রিকেন্ট তৈরি করে। ইয়ারোস্লাভলের গভর্নর মিখাইল ইয়েভরায়েভ জানিয়েছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় একজন নিহত এবং ২৭ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১০ জন বাসের ওপর ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আহত হন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা রাতভর ১৮টি রুশ অঞ্চল এবং অধিকৃত ক্রিমিয়া মিলিয়ে মোট ৫১২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ জানিয়েছেন, একটি ড্রোন সুপারমার্কেটে আঘাত হেনেছে এবং পাশের একটি ক্লিনিকের জানালা ভেঙে গেছে। এছাড়া ক্রিমিয়ার সেভাস্টোপলে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে চারজন আহত হয়েছেন বলে রুশপন্থী গভর্নর মিখাইল রাজভোজায়েভ জানিয়েছেন।

