নরওয়ের রাজা পঞ্চম হারাল্ড ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শুক্রবার সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে ওসলোর ন্যাশনাল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৩৭ সালে আস্কারে জন্মগ্রহণ করা হারাল্ড ছিলেন ১৩৭০ সালের পর নরওয়েতে জন্ম নেওয়া প্রথম রাজপুত্র। তার দাদা হাকোন সপ্তম ১৯০৫ সালে সুইডেন ও নরওয়ের ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাজা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে নাৎসি বাহিনী নরওয়ে দখল করলে মাত্র তিন বছর বয়সে হারাল্ডকে তার মা ও বোনদের সঙ্গে প্রথমে সুইডেন এবং পরে নৌপথে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সে সময় তার বাবা ও দাদা নরওয়ের সরকারের সঙ্গে ব্রিটেনে নির্বাসনে ছিলেন। নাৎসিদের দাবির কাছে মাথা নত না করায় হাকোন সপ্তম জনগণের কাছে ব্যাপক সম্মান অর্জন করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালে রাজপরিবারের সদস্যরা প্রায়ই হোয়াইট হাউসের অতিথি হতেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে কানাডায় নরওয়েজিয়ান বিমান ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান উদ্বোধনের মাধ্যমে হারাল্ড তার প্রথম সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৫ সালের জুনে যুদ্ধ শেষে পরিবারটি নরওয়েতে ফিরে আসে। হারাল্ড পাবলিক স্কুল, নরওয়েজিয়ান মিলিটারি কলেজ এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।
তার বাবা রাজা পঞ্চম ওলাভের মৃত্যুর পর ১৯৯১ সালের ২১ জানুয়ারি হারাল্ড সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার রাজত্বকালে নরওয়েতে তেল ও গ্যাস শিল্পে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তার বাবার মতো নৌচালনায় অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তিনি তার ইয়ট চালিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। যৌবনে ইউরোপের অভিজাত পরিবারের অনেক রাজকন্যার বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দীর্ঘ নয় বছর অপেক্ষার পর তিনি ব্যবসায়ী কন্যা সোনিয়া হারাল্ডসেনকে বিয়ে করার অনুমতি পান। ১৯৬৮ সালের ২৯ আগস্ট তাদের বিয়ে হয়। তাদের দুই সন্তান হাকোন ও মার্থা লুইস রয়েছে। ১৯৯০ সালে নরওয়ের সংবিধানে পরিবর্তন এনে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা হলেও তা পূর্ববর্তী ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হওয়ায় হাকোন তার বড় বোন মার্থা লুইসের চেয়ে উত্তরাধিকারের তালিকায় এগিয়ে থাকেন।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহার স্টোরে এক বিবৃতিতে বলেন, পুরো জাতি আজ শোকাহত এবং দীর্ঘ জীবন ধরে নরওয়ের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার জন্য মানুষ তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতায় পূর্ণ। তিনি আরও বলেন, তিন দশকের বেশি সময় ধরে রাজা হিসেবে হারাল্ড নরওয়ের জনগণের প্রতি অবিচল আস্থা রেখেছেন। রাজা হারাল্ড তার বাবা ও দাদার মূলমন্ত্র 'সবই নরওয়ের জন্য' অনুসরণ করতেন এবং রাজতন্ত্রকে আধুনিক করার চেষ্টা চালিয়েছেন।
২০১১ সালে ডানপন্থী চরমপন্থী আন্দ্রেস বেরিং ব্রেভিকের হামলায় ৭৭ জন নিহত হওয়ার পর রাজা হারাল্ডের আবেগপূর্ণ ভাষণ দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এছাড়া ২০১৬ সালে তিনি এলজিবিটিকিউ+ সমতা, শরণার্থী এবং ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। সম্প্রতি রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছু বিতর্ক সামনে এসেছে। এর মধ্যে রানি মেটে-মারিটের সঙ্গে যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সংযোগ নিয়ে সমালোচনা এবং তার বড় ছেলে মারিয়াস বোর্গ হোইবির কারাদণ্ড উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ২০২২ সালে রাজকুমারী মার্থা লুইস তার রাজকীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। ২০২৪ সালে ডেনমার্কের রানি মার্গারেট সিংহাসন ছাড়ার পর রাজা হারাল্ড বলেছিলেন, তার শপথ আজীবন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি মালয়েশিয়া ও স্পেনের টেনেরিফে ভ্রমণের সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

