নেপালের হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এত বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে যে, দেশটির একটি জেলায় কর্তৃপক্ষ পরিচয় শনাক্ত করার আগেই মরদেহগুলো অস্থায়ী কবরে সমাহিত করা শুরু করেছে। এই ঘটনায় হিন্দু ধর্মীয় শেষকৃত্য রীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
নেপালের দক্ষিণ-কেন্দ্রীয় চিতওয়ান জেলায় বুধবারের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এই বিপর্যয়ে নেপাল ও তিব্বতে অন্তত ৮০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩,০০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া প্রায় ২৫০টি মরদেহ এখন শনাক্তের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্যার কেন্দ্রস্থল থেকে ভোতেকোশি নদী দিয়ে ভেসে আসা এসব মরদেহ কয়েকশ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ানে উদ্ধার করা হয়েছে।
ফরেনসিক টিমের ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকায় শনিবার কর্তৃপক্ষ প্রায় ১০০টি মরদেহ অস্থায়ীভাবে সমাহিত করে। সংবাদমাধ্যম ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি খননযন্ত্র দিয়ে লাল মাটিতে বিশাল এক পরিখা খুঁড়ে মরদেহগুলো দাফন করা হয়। পুলিশ পরিদর্শক অনিল থাপা জানিয়েছেন, রবিবার আরও ৫০টি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে, যা পরে সমাহিত করা হবে।
কর্তৃপক্ষ প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ, মুখের বৈশিষ্ট্যসহ অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য রেকর্ড করছে এবং পরিবারের দাবির সুবিধার্থে প্রতিটি মরদেহে একটি রেফারেন্স নম্বর দেওয়া হয়েছে। অনিল থাপা জানান, বন্যার পানিতে চার দিন ডুবে থাকায় মরদেহগুলো উদ্ধারের সময় থেকেই পচন ধরতে শুরু করেছিল। এছাড়া উচ্চ আর্দ্রতা ও প্রচণ্ড গরমে পচন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হওয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বন্যায় ঘরবাড়ি, যানবাহন ও খামারের ট্রাক্টরগুলো এখনো কাদায় চাপা পড়ে আছে। এর মধ্যে রবিবার নতুন করে ভূমিধসের কারণে রাজধানী কাঠমান্ডু ও চিতওয়ানের মধ্যে সংযোগকারী প্রধান মহাসড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
এই গণকবর নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অনেক বাসিন্দা মনে করছেন, মৃতদের শেষকৃত্যের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি এবং তাদের প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী দেশটিতে শেষকৃত্যের জন্য দাহ করা প্রথাগত রীতি। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে থাকা পরিবারগুলো এবং অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।
রুবি চৌধুরী নামে এক নারী, যার দুই আত্মীয় নিখোঁজ, তিনি বলেন, পরিবারের সম্মতি ছাড়া এভাবে দাফন করা উচিত হয়নি। তিনি দাবি করেন, মৃতদের মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন এবং নদীর তীরে পরিবারের উপস্থিতিতে দাহ করার রীতি অনুসরণ করা উচিত ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাবুরাম ভট্টরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং নিখোঁজদের পরিবারের সাথে আলোচনা ছাড়া অজ্ঞাত লাশ নিষ্পত্তি করা অনুচিত। তিনি প্রয়োজনে অস্থায়ী মর্গ বা হিমাগার তৈরির পরামর্শ দেন।
তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সীমিত সক্ষমতার কারণে এটি কেবল সাময়িক ব্যবস্থা। অনিল থাপা বলেন, এটি স্থায়ী কোনো দাফন নয়। যদি পরে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তবে পরিবারগুলো মরদেহ নিয়ে গিয়ে যথাযথ শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারবে। নেপালের পররাষ্ট্র সচিব অমৃত বাহাদুর রাই এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনেই এই দাফন করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে পরিবারগুলো চাইলে দেহাবশেষ উত্তোলন করে ধর্মীয় রীতি পালন করতে পারবে।

