জাতিসংঘ বর্তমানে প্রচলিত বিশ্ব মানচিত্রের পরিবর্তে এমন একটি মানচিত্র গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে, যা আফ্রিকা মহাদেশের মতো অঞ্চলগুলোর প্রকৃত আকারকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে সক্ষম। 'কারেক্ট দ্য ম্যাপ' শিরোনামের একটি প্রস্তাবনা সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো মারকাটর মানচিত্রে থাকা অসামঞ্জস্যগুলো সংশোধন করা। এই মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ড এবং আফ্রিকা মহাদেশকে প্রায় সমান আকারের দেখানো হয়, অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
এর বিকল্প হিসেবে 'ইকুয়াল আর্থ' প্রজেকশন নামক নতুন একটি মানচিত্র গ্রহণের কথা বলা হয়েছে, যা ভূখণ্ডের প্রকৃত আকারকে আরও সঠিকভাবে উপস্থাপন করে। তবে এই মানচিত্রের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রকর জেরার্ডাস মারকাটর কর্তৃক তৈরি এই মানচিত্রটি ৪৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কার্টোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক জেমস চেশায়ারের মতে, ইউরোপীয় নাবিকদের সমুদ্র ভ্রমণের সুবিধার্থে এই মানচিত্রটি তৈরি করা হয়েছিল। কম্পাস বিয়ারিং অনুসরণ করে মানচিত্রে সরলরেখা টানার জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর ছিল, তবে গোলকীয় পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক সমতলে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে নিরক্ষরেখার কাছাকাছি দেশগুলোকে ছোট এবং মেরু অঞ্চলের দেশগুলোকে অনেক বেশি বিস্তৃত দেখানো হয়।
মারকাটর মানচিত্রের সমালোচকরা মনে করেন, কোনো স্থানকে ছোট বা বড় দেখানোর একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, এই মানচিত্রটি আফ্রিকার বিশাল জনসংখ্যা, সম্পদ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে অবমূল্যায়ন করে। তিনি বলেন, মানচিত্র কেবল ভ্রমণের পথপ্রদর্শক নয়, এটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অঞ্চলগুলোর ধারণাকে রূপ দেয়।
নতুন 'ইকুয়াল আর্থ' মানচিত্রটি ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রকর তৈরি করেন। এটি আফ্রিকার ইউনিয়নভুক্ত ৫৪টি সদস্য দেশ এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের সমর্থন লাভ করে। তবে এর অসুবিধা হলো, এটি মারকাটর মানচিত্রের মতো সরলরেখা বা নেভিগেশনের সুবিধা প্রদান করে না। অধ্যাপক চেশায়ারের মতে, একটি মানচিত্রে একই সাথে আকার, আকৃতি এবং দূরত্ব নিখুঁতভাবে বজায় রাখা সম্ভব নয়, কারণ পৃথিবীকে গোলক থেকে সমতলে আনতে হলে কোনো না কোনো বৈকল্য ঘটবেই।
এর আগে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পেটার্স 'পেটার্স ম্যাপ প্রজেকশন' ডিজাইন করেছিলেন, যা ১৮৫৫ সালে জেমস গলের বর্ণিত প্রজেকশনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি স্থলভাগের আকার সঠিকভাবে দেখালেও মানচিত্রের আকৃতি বিকৃত করে ফেলে। ফলে মেরু অঞ্চল সংকুচিত এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলো প্রসারিত দেখায়। যদিও এটি গ্রিনল্যান্ড-আফ্রিকার আকারের অসামঞ্জস্য দূর করে, তবুও সরলরেখা ও কম্পাস বিয়ারিংয়ের অভাবে এটি নেভিগেশনের জন্য অকার্যকর।

