ক্রীড়াজগতে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক হলেও মাঠের আচরণ ও স্পোর্টসম্যানশিপের গুরুত্ব অপরিসীম। গত ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হারিয়েছে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে মাঠের লড়াইয়ে হারের চেয়েও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে আলবিসেলেস্তেদের চরম অপেশাদার আচরণ নিয়ে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনা কেবল ট্রফিই হারায়নি, বরং হারিয়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাদের পেশাদার মর্যাদাও।
পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলে ফাইনালে ওঠা আর্জেন্টিনা চরম উত্তেজনাকর মুহূর্তে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ম্যাচের যোগ করা সময়ে মারাত্মক ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর ক্ষোভ সামলাতে না পেরে স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়ায় আর্জেন্টিনা দল। স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরে বিতর্কের জন্ম দেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। এছাড়া পুরো ম্যাচজুড়েই পারেদেস-এনজোদের একের পর এক ফাউল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
মাঠের বাইরেও আর্জেন্টিনার আচরণে স্পোর্টসম্যানশিপের চরম অবমাননা দেখা গেছে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ট্রফি দেওয়ার সময় বিজয়ী স্পেন দলের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা, যা গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার সমর্থককে হতাশ করেছে। এরপর ফিফার নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত 'মিক্সড-জোন'-এ গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, অধিনায়ক লিওনেল মেসির নেতৃত্বে পুরো দলটি স্টেডিয়ামের পেছনের দরজা দিয়ে দ্রুত চলে যায়। এতে উপস্থিত সমর্থক ও সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
আর্জেন্টিকার এই বিশৃঙ্খলার বিপরীতে স্পেনের তরুণ দলটি মাঠের শান্ত ও সংযত আচরণের মাধ্যমে অনন্য এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অসাধারণ নৈপুণ্যে পুরো টুর্নামেন্টে ৮টি ম্যাচে তারা মাত্র ১টি গোল হজম করেছে। এই জয়ের মাধ্যমে পুরুষ ও নারী উভয় বিভাগে একই সঙ্গে বিশ্বকাপ, ইউরো ও অলিম্পিক শ্রেষ্ঠত্বের ঐতিহাসিক ট্রিপল জয়ের বিরল নজির গড়ল স্পেন। দলটির প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘শুধু মেধা বা কৌশলই নয়, ভালো মানবিক মূল্যবোধ ও সহমর্মিতা সম্পন্ন খেলোয়াড়দের নিয়েই একটি সত্যিকারের বিশ্বজয়ী দল গড়ে ওঠে।’
ম্যাচ শেষে অবশ্য নিজের দলের ভুল স্বীকার করেছেন আর্জেন্টিনার ম্যানেজার লিওনেল স্কালোনি। তিনি মন্তব্য করেন, ‘জয়ের মতো পরাজয়কেও আমাদের হাসিমুখে ও সাহসের সঙ্গে মেনে নিতে শিখতে হবে।’ ক্রীড়াঙ্গনে পরাজয়কে বিনয়ের সঙ্গে মেনে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানোর মাধ্যমেই আসল সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল বিশ্ব ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এই চিরন্তন বার্তাই রেখে গেল যে, ট্রফি জয়ের চেয়ে পরাজয়ের মুহূর্তে খেলোয়াড়দের আচরণই দিনশেষে ইতিহাসে স্থায়ী আসন তৈরি করে।

