উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড সেউতার সৈকতগুলো থেকে শত শত অভিবাসীকে বন্দরে নির্মিত একটি নতুন তাঁবু শিবিরে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে দেশটির পুলিশ। দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে সৈকতে বসবাস করা এই অভিবাসীদের স্থানান্তর করার সময় সেখানে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও চরম উত্তেজনা তৈরি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শূন্যে গুলি ছুড়েছে বলেও জানা গেছে।
স্প্যানিশ সরকারি সংবাদ সংস্থা 'এফে' (Efe) জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৭টায় (জিএমটি ০৫:০০) এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ৩,০০০ অভিবাসীকে এই নতুন শিবিরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার ধারণক্ষমতা মাত্র ১,৭০০ জন।
সৈকত থেকে বন্দর পর্যন্ত ২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে যাওয়ার সময় অনেকে পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে পালানোর চেষ্টা করে।
অন্ধকারেই তরুণদের দৌড়াদৌড়ি করার দৃশ্য ভিডিওতে ধরা পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ড্রোন টেকনিশিয়ানসহ ১৭০ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। তবে পরবর্তীতে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত জুলাই মাসে মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রায় ৭২,০০০ অভিবাসী প্রবেশ করেছিল। তাদের বেশিরভাগই পরে ফিরে গেলেও সেউতার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, এখনো প্রায় ১৩,০০০ অভিবাসী সেখানে রয়ে গেছে। তবে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকারের মতে এই সংখ্যা আরও কম।
মূলত অভিবাসীদের এক জায়গায় জড়ো করে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়া এবং তাদের প্রশাসনিক মর্যাদা নির্ধারণের লক্ষ্যেই সরকার এই শিবিরের ব্যবস্থা করেছে।
অভিবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে সেউতার স্থানীয় বাসিন্দারাও চরম ক্ষুব্ধ। ১৮.৫ বর্গকিলোমিটারের এই ক্ষুদ্র দ্বীপের বাসিন্দারা নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এমনকি কিছু বাসিন্দা অভিবাসীদের তৈরি করা অস্থায়ী আশ্রয়স্থল ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং তাদের জন্য পাঠানো ত্রাণ সহায়তা সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করেছেন।
সেউতার রক্ষণশীল মেয়র হুয়ান হেসুস ভিভাস ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বলেছেন, অভিবাসীদের এই অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ সেউতাকে একটি "প্রেসার কুকারে" পরিণত করেছে। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও আনন্দ হারিয়ে ফেলেছেন।
এই সংকট স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলগুলো তাঁর সংকট ব্যবস্থাপনার কড়া সমালোচনা করছে। রক্ষণশীল পিপলস পার্টির এস্টার মুনোজ সরাসরি সরকারকে দায়ী করে বলেছেন, "সেউতায় এই অনুপ্রবেশ এবং মানুষের মৃত্যুর জন্য সরকার সরাসরি দায়ী।" বিরোধী দলের অভিযোগ, সানচেজ এই অনুপ্রবেশের কথা আগে থেকেই জানতেন।
তবে সানচেজ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটি আগে থেকে অনুমান করা অসম্ভব ছিল। যদিও সরকারি গোয়েন্দা নথিতে দেখা গেছে, ঘটনার আগের দিনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণ-অনুপ্রবেশের ডাক দেওয়ার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী সানচেজ এই সংকটের জন্য মানব পাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজবকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি মানবিক সংকটের পাশাপাশি শহরের অভ্যন্তরীণ একটি প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।
এই ঘটনা সানচেজের জন্য কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি করেছে। ইতালির সাথে স্পেনের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন চলছে, পাশাপাশি মরক্কোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতেও হিমশিম খাচ্ছেন তিনি।
মূলত স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট সমুদ্রপথে আটক অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে রায় দেওয়ার পরই এই সংকটের সূত্রপাত হয়। এই রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে এবং অর্থের বিনিময়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।
এর জের ধরে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত বেড়া ভেঙে এবং সাঁতরে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এই বিপজ্জনক পারাপারের সময় পানিতে ডুবে অন্তত ১০০ জন মারা গেছেন।

