সান্তিয়াগোর প্লাজা ডি আরমাসের চারপাশে দুপুরের খাবারের সময় ভিড় জমান স্থানীয়রা। কয়েক দশক ধরে চিলির জনপ্রিয় এই খাবার ‘কম্পলেতো’ সব শ্রেণির মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও প্রিয় ছিল। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রভাবে এই জনপ্রিয় খাবারটিও এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আন্তোনিয়া ব্রাভো জানান, কিছুদিন আগেও তিনি যে কম্পলেতো ২৫০০ পেসো বা ২.৬০ ডলারে কিনতেন, এখন তা ৩৫০০ থেকে ৪০০০ পেসো বা ৩.৬০ থেকে ৪.১০ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
চিলির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটি এখন মন্দার দ্বারপ্রান্তে। টানা দুই প্রান্তিকে অর্থনৈতিক সংকোচন এবং বেকারত্বের হার গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯.৫ শতাংশে পৌঁছানোয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। গত ১২ মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৪.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার প্রধান কারণ খাদ্য ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় চিলির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ শতাংশ থেকে ১.৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ০.২৫ শতাংশ থেকে ০.৭৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রোসানা কোস্তা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান দুর্বলতা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
১৯৩০-এর দশকে সান্তিয়াগোর ছোট ছোট দোকানে এই খাবারের জন্ম। সসেজ, সাওয়ারক্রাট, টমেটো এবং ঘরে তৈরি আলুর মেয়োনিজ দিয়ে তৈরি এই খাবারটি সময়ের সঙ্গে অ্যাভোকাডোসহ বিভিন্ন উপাদানে সমৃদ্ধ হয়ে পূর্ণাঙ্গ খাবারে রূপ নেয়। যে রেস্তোরাঁটি এটি উদ্ভাবন করেছিল, তার ব্যবস্থাপক গুইলারমো সিড জানান, তখন মানুষ কম সম্পদ নিয়ে এসেও এই খাবারটি খেত, আর আজও তারা পূর্ণাঙ্গ দুপুরের খাবারের বদলে কম্পলেতো বেছে নেয়।
সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগস্ট মাসে চিলির মৌলিক খাদ্য ঝুড়ির দাম এক বছর আগের চেয়ে ৫ শতাংশ বেড়েছে। অথচ দেশটির মাসিক ন্যূনতম মজুরি প্রায় ৫৮০ ডলার। এর সঙ্গে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করেছে। শিক্ষক মাউরিসিও আরাভেনা অভিযোগ করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েই চলেছে এবং মজুরি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, আমরা প্রায় পাঁচ বছর পিছিয়ে আছি। আরেক শিক্ষক তাবাতা মার্তিনিচ জানান, বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে, তাই সবাই বাড়িতে রান্না করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্ত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছেন। তবে বিশ্লেষক গুইলারমো হোলজম্যানের মতে, নাগরিকদের প্রত্যাশা এখন হতাশায় রূপ নিচ্ছে। কাস্ত সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, দেশে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি এবং প্রবৃদ্ধি কম। সরকার একটি ‘শ্রম জরুরি পরিকল্পনা’ তৈরির নির্দেশ দিলেও তার বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে কর সংস্কারের একটি প্রস্তাব কংগ্রেস পাস করলেও তা এখনো সাংবিধানিক আদালতে ঝুলে আছে। হোলজম্যানের মতে, আয় ও পণ্যের দামের মধ্যকার এই ব্যবধান সামাজিক অস্থিরতার মূল কারণ হয়ে উঠতে পারে।

