কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন যাযাবর বা ভ্রাম্যমাণ স্বর্ণ খনি শ্রমিকরা। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, দুর্গম ও অনিরাপদ অঞ্চলে এই শ্রমিকদের ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন এবং তাদের ট্র্যাক করার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইতুরির ইগা-বারিয়ের (Iga-Barrière) নামক একটি বড় খনিতে কাজ করে ১১ বছর বয়সী শিশু আইজ্যাক বাতিসা (Isaac Batisa)। দৈনিক মাত্র ২ ডলার উপার্জনের আশায় সে খনিতে মাটি খোঁড়ে। বাতিসা জানায়, "আমরা এখানে ইবোলা সম্পর্কে কিছুই জানি না।" কঙ্গোর বিদ্রোহীদের হামলায় বাবা-মা ও দুই ভাইকে হারানোর পর বাতিসা এখন তার খালা ও পাঁচ ভাইবোনের সাথে থাকে। খালার পরামর্শেই সে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এসেছে। ইউনিসেফের (UNICEF) হিসাব অনুযায়ী, কঙ্গোর ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১৫ শতাংশই শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ২০২৪ সালের ওইসিডি (OECD)-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দেশটিতে প্রায় ২০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক ও ক্ষুদ্র খনিতে কাজ করে।
কঙ্গোয় চলমান এই ইবোলা প্রাদুর্ভাবটি ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভকারী প্রাদুর্ভাব। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২,৩২৫ জন, যার প্রায় ৯০ শতাংশই ইতুরিতে। খনির গভীর সুড়ঙ্গে কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকরা কাজ করেন। হাত ধোয়া বা সামাজিক দূরত্বের মতো স্বাস্থ্যবিধি এখানে পুরোপুরি উপেক্ষিত। ৩৬ বছর বয়সী খনি শ্রমিক সিঙ্গোমা আইমে (Singoma Aimé) বলেন, "আমাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষার অভাব রয়েছে। এখানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।"
স্বাস্থ্যকর্মী মারি এনদিকা (Mari Ndika) জানান, খনি শ্রমিকরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে আসেন, যা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। সম্প্রতি ইবোলা আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা দুই খনি শ্রমিককে ট্র্যাক করা সম্ভব হয়নি কারণ তারা অন্য খনিতে চলে গেছেন। কমিউনিটি কর্মী অ্যানা এনড্রয় কানসিম (Anna Ndroy Kansime) বলেন, "তারা এমন এক গন্তব্যে চলে গেছে যা আজও অজানা।" তিনি আরও জানান, শ্রমিকদের নিবন্ধন করার কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় গর্ভবতী নারীরাও খনিতে কাজ করেন। কানসিমের মতে, "অনেক পরিবারের জন্য স্বর্ণই হলো খাদ্য কেনার একমাত্র উৎস।"
কঙ্গোর ইবোলা প্রাদুর্ভাবটি মূলত বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) ভাইরাসের কারণে হচ্ছে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা ভ্যাকসিন নেই। এটি ২০১৪-২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার ইবোলা প্রাদুর্ভাবের (যা ১১,০০০-এর বেশি মানুষের প্রাণ কেড়েছিল) চেয়েও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণ সুদান সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরেও আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (MSF)-এর জরুরি সমন্বয়ক ট্রিশ নিউপোর্ট (Trish Newport) বলেন, "পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা এমন পরিবারও দেখছি যেখানে ১৫ জন সদস্য মারা গেছেন।"
ইতুরিতে এডিএফ (ADF) ও কোডেকো (CODECO)-সহ প্রায় ১০০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এই সংঘাত ও চরম দারিদ্র্যই বাতিসার মতো শিশুদের খনিতে কাজ করতে বাধ্য করছে।

