অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদেরই বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়কে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে অভিহিত করেছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে লাল-সবুজ বাহিনী তাদের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনটি ঘটিয়েছে। চতুর্থ দিনের বিকেলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ৫৭ রান তাড়া করতে নেমে মুমিনুল হকের উইনিং শটের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। এর আগে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে অলআউট করে দেয় সফরকারীরা।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বলেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটে তিন ফরম্যাটেই অনেক বড় বড় জয় আছে। তবে তিনি মনে করেন, এখন পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয় এবং এর পেছনে প্রচুর কঠোর পরিশ্রম ছিল। প্রথম দিন থেকেই যেভাবে দল আধিপত্য বিস্তার করে খেলেছে, তা সত্যিই গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। শান্ত বলেন, প্রতিটি সেশন ধরে ধরে পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলার পরিকল্পনা ছিল তাদের। চার দিনের খেলায় পুরো দল যেভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে, তাতেই এই সাফল্য এসেছে।
এই ম্যাচে পেসার হাসান মাহমুদের ৯ উইকেট শিকার, তানজিদ হাসান তামিমের অভিষেক টেস্ট সেঞ্চুরি এবং মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য জয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। তবে শান্ত কোনো একক খেলোয়াড়কে নয়, বরং পুরো দলকেই কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, তার চোখে পুরো বাংলাদেশ দলই 'ম্যান অব দ্য ম্যাচ'। কারণ দলের প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অবদান রেখেছেন। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমে তামিমের প্রথম সেঞ্চুরিকে বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করার পাশাপাশি কঠিন কন্ডিশনে মিরাজের ব্যাটিং ও bowling-এর প্রশংসাও করেন তিনি।
অধিনায়ক বিশেষভাবে প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের ২০ রানের ইনিংস এবং লোয়ার অর্ডারের হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনের ব্যাটিং অবদানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি মনে করেন, লোয়ার অর্ডারের এই অবদান দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং তাদের বড় ধরনের কৃতিত্ব দেওয়া উচিত।
টেস্ট সিরিজ শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ দলের সামর্থ্য নিয়ে চারদিকে নানা সমালোচনা শুরু হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে শান্ত জানান, বাইরের আলোচনা বা সমালোচনা নিয়ে তারা খুব একটা ভাবেননি। তিনি বলেন, ভালো খেললে ভালো কথা হবে এবং খারাপ খেললে সমালোচনা হবে—এটাই স্বাভাবিক। খেলোয়াড় হিসেবে তাদের কাজ নিয়মিত পারফর্ম করা এবং নিজেদের প্রক্রিয়ার ওপর মনোযোগ দেওয়া। কন্ডিশন যে কঠিন ছিল এবং অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ যে বিশ্বমানের ছিল, তা অকপটে স্বীকার করেন তিনি। তবে এই কঠিন挑戰কে নেতিবাচকভাবে না দেখে উপভোগ করার মানসিকতা নিয়েই তারা মাঠে নেমেছিলেন।
এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে বিশ্ব ক্রিকেটে একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়া গেছে বলে বিশ্বাস করেন শান্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেকোনো কন্ডিশনে ভালো খেলার এই সামর্থ্য প্রমাণের পর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দল আরও বেশি টেস্ট সিরিজ খেলার আমন্ত্রণ পাবে। কন্ডিশন অনুযায়ী দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হবে বলে তিনি মনে করেন।
আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের দৌড়ে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে থাকলেও শান্ত এখনই খুব বেশি দূরের কথা ভাবছেন না। তিনি বলেন, পয়েন্ট টেবিলে সুযোগ থাকলেও ড্রেসিংরুমে তারা ম্যাচ বাই ম্যাচ এবং সিরিজ ধরে এগোনোর পরিকল্পনা করছেন। টেস্ট দল হিসেবে বাংলাদেশ এখনো খুব বেশি অভিজ্ঞ নয়, তবে ধীরে ধীরে একটি ভালো অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রস্তুতি ম্যাচের বাজে পারফরম্যান্স নিয়ে শান্ত বলেন, সেটি ছিল কেবলই একটি প্রস্তুতি ম্যাচ এবং সেখানে সবাইকে সুযোগ দেওয়ার কারণে পারফরম্যান্স তেমন ভালো হয়নি, যা মূল টেস্ট ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলেনি।
ঐতিহাসিক এই জয়ের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিডিও কলের মাধ্যমে শান্ত ও পুরো দলের সঙ্গে কথা বলেন। শান্ত জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। শান্ত আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেটের প্রতি ভীষণ আবেগপ্রবণ। হারের পর অনেক সময় তারা কেঁদে ফেলেন, তাই এই জয় তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে এবং এটি তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের একটি মুহূর্ত।

