মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের বিরুদ্ধে ডোমিনিয়ন ভোটিং সিস্টেমসের দায়ের করা বহুল আলোচিত মানহানি মামলার মূল ভিত্তি হলো ২০টি সুনির্দিষ্ট সম্প্রচার ও টুইট। ডোমিনিয়নের অভিযোগ, ফক্স নিউজ জেনেশুনে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়েছে এবং এর ফলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারির মধ্যে এই সম্প্রচার ও টুইটগুলো করা হয়েছিল।
এই মামলায় ফক্স নিউজের উপস্থাপক জিনাইন পিরো, লু ডবস ও মারিয়া বার্টিরোমো এবং ট্রাম্পপন্থী নির্বাচন প্রত্যাখ্যানকারী সিডনি পাওয়েল, রুডি জুলিয়ানি ও মাইক লিন্ডেলের সাক্ষাৎকার এবং লু ডবসের বেশ কয়েকটি টুইটকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডোমিনিয়নের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মূলত চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত: ডোমিনিয়ন নির্বাচনে জালিয়াতি করেছে, তারা অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভোট বদলে দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার সাথে তাদের যোগসূত্র রয়েছে এবং রাজনীতিবিদরা এই কোম্পানির প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য অনৈতিক সুবিধা বা কিকব্যাক নিয়েছেন।
মামলার বিচারক ইতিমধ্যেই রায় দিয়েছেন যে এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে ডোমিনিয়নকে জড়িয়ে করা মন্তব্যগুলোর একটিও সত্য নয়। এখন জুরির কাজ হবে ফক্স নিউজ "প্রকৃত বিদ্বেষ" (actual malice) বা জেনেশুনে অসত্য প্রচার করেছিল কি না তা নির্ধারণ করা। ডোমিনিয়ন ১.৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে, যা ফক্স নিউজ অতিরিক্ত বলে দাবি করেছে। ফক্স নিউজ কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করে একে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে অভিহিত করেছে।
ডোমিনিয়নের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে ফক্স নিউজের সেই ২০টি বিতর্কিত সম্প্রচার ও টুইটের বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. ৮ নভেম্বর, ২০২০ (সানডে মর্নিং ফিউচারস): মারিয়া বার্টিরোমো সিডনি পাওয়েলকে ডোমিনিয়ন সফটওয়্যার ও ভোটের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন করেন। জবাবে পাওয়েল দাবি করেন, কম্পিউটার সিস্টেমে ভোট বদলে দেওয়া বা অস্তিত্বহীন ভোট যোগ করার মাধ্যমে জালিয়াতি করা হয়েছে।
২. ১২ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): রুডি জুলিয়ানি দাবি করেন, ডোমিনিয়ন একটি বিদেশি কোম্পানি যা ভেনেজুয়েলার হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠদের মালিকানাধীন এবং এটি নির্বাচন প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।
৩. ১৩ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): সিডনি পাওয়েল দাবি করেন, ভেনেজুয়েলায় হুগো চাভেজের পক্ষে ভোট কারচুপির জন্য ডোমিনিয়ন তৈরি করা হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু গভর্নর ও সেক্রেটারি অব স্টেট এই সিস্টেম কেনার মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। উপস্থাপক লু ডবস এই অভিযোগের দ্রুত তদন্তের তাগিদ দেন।
৪. ১৪ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবসের টুইট): লু ডবস রুডি জুলিয়ানির একটি টুইট রিটুইট করে লেখেন যে, ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী জালিয়াতি কতটা ব্যাপক তা ডোমিনিয়ন ও স্মার্টম্যাটিক ভোটিং কোম্পানির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। জুলিয়ানি দাবি করেছিলেন, ডোমিনিয়ন মিশিগান, অ্যারিজোনা ও জর্জিয়ায় ভোট গণনা করছিল।
৫. ১৪ নভেম্বর, ২০২০ (জাস্টিস উইথ জাজ জিনাইন): সিডনি পাওয়েল বলেন, হুগো চাভেজ ও মাদুরোর পুনর্নির্বাচন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছিল এবং এটি একটি বিশাল অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। উপস্থাপক জিনাইন পিরো এতে সম্মতি প্রকাশ করেন।
৬. ১৫ নভেম্বর, ২০২০ (ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস সানডে): মারিয়া বার্টিরোমো বলেন, সিডনি পাওয়েল ডোমিনিয়ন ব্যবহারের বিনিময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবারগুলোর অনৈতিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে কথা বলছেন।
৭. ১৫ নভেম্বর, ২০২০ (সানডে মর্নিং ফিউচারস): সিডনি পাওয়েল দাবি করেন, তাদের কাছে শপথ নেওয়া সাক্ষীর জবানবন্দি রয়েছে যে এই সফটওয়্যারটি নির্বাচন কারচুপির জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল।
৮. ১৬ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): পাওয়েল দাবি করেন, একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার হলফনামা অনুযায়ী স্মার্টম্যাটিক সিস্টেম এমনভাবে তৈরি যাতে সনাক্ত না হয়েই ভোট পরিবর্তন করা যায়। তিনি ভুলভাবে দাবি করেন যে স্মার্টম্যাটিক ডোমিনিয়নের মালিক।
৯. ১৮ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): জুলিয়ানি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুর বন্ধুদের (মাদুরো) দ্বারা পরিচালিত একটি বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে ভোট হওয়া অত্যন্ত আপত্তিকর।
১০. ১৯ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): পাওয়েল দাবি করেন, স্মার্টম্যাটিক ও ডোমিনিয়ন কোম্পানির বিরুদ্ধে যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ রয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম প্রমাণে হাজার হাজার মানুষ ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছে।
১১. ২১ নভেম্বর, ২০২০ (জাস্টিস উইথ জাজ জিনাইন): জিনাইন পিরো বলেন, ট্রাম্পের আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন ডোমিনিয়ন কিউবান অর্থে ভেনেজুয়েলায় শুরু হয়েছিল এবং স্মার্টম্যাটিক সফটওয়্যারের সাহায্যে তারা ভোট বদলে দিতে সক্ষম।
১২. ২৪ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): পাওয়েল ও ডবস ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে জালিয়াতির বিষয়ে আলোচনা করেন। ডবস বলেন, অনেক আমেরিকানই ডোমিনিয়নকে নিয়ে সন্দেহ করছেন।
১৩. ৩০ নভেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): পাওয়েল দাবি করেন, বিভিন্ন রাজ্যে ভোট বদলে দেওয়ার জন্য সিস্টেমটি সেট করা হয়েছিল এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় জালিয়াতি।
১৪. ৩০ নভেম্বর, ২০২০ (হ্যানিটি): পাওয়েল বলেন, মেশিনটি একটি অ্যালগরিদম চালিয়ে ট্রাম্পের ভোট কেটে বাইডেনের পক্ষে যোগ করেছে।
১৫. ৪ ডিসেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): ডবস ট্রাম্প সমর্থক ফিল ওয়ালড্রনকে প্রশ্ন করেন, ডোমিনিয়ন ভোটিং সিস্টেমের অ্যালগরিদমগুলো অনিরাপদ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল কি না।
১৬. ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ (লু ডবসের টুইট): লু ডবস টুইটারে একটি নথি শেয়ার করে লেখেন, ২০২০ সালের নির্বাচন ছিল একটি সাইবার পার্ল হারবার। নথিতে দাবি করা হয়, ডোমিনিয়ন মেশিনে এমন কন্ট্রোলার রয়েছে যা দিয়ে ভোট এক প্রার্থী থেকে অন্য প্রার্থীর দিকে সরিয়ে নেওয়া যায়।
১৭. ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ (লু ডবস টুনাইট): এই তারিখের অনুষ্ঠানটিতেও ডোমিনিয়নের বিরুদ্ধে একই ধরণের মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়।
১৮. ১০ ডিসেম্বর, ২০২০ (লু ডবসের আরেকটি টুইট): লু ডবস সিডনি পাওয়েলের সাক্ষাৎকারের ভিডিওসহ টুইট করে একে সাইবার পার্ল হারবার বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন ডোমিনিয়ন ও স্মার্টম্যাটিকের সাহায্যে নির্বাচন সাইবার হামলার শিকার হয়েছে।
১৯. ১২ ডিসেম্বর, ২০২০ (ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস): উপস্থাপক উইল কেইন, পিট হেগসেথ ও র্যাচেল ক্যাম্পোস-ডাফির উপস্থিতিতে জুলিয়ানি দাবি করেন, ডোমিনিয়ন মেশিনটি ফুটো থাকা সুইস চিজের মতো এবং এটি নির্বাচন চুরির জন্য তৈরি।
২০. ২৬ জানুয়ারি, ২০২১ (টাকার কার্লসন টুনাইট): মাইক লিন্ডেল বলেন, ডোমিনিয়ন যেন তার বিরুদ্ধে মামলা করে, কারণ তাহলে তিনি তার কাছে থাকা প্রমাণগুলো দ্রুত সবার সামনে আনতে পারবেন।

