সোশ্যাল মিডিয়ায় "ট্রেড ওয়াইফ" বা ঐতিহ্যবাহী গৃহবধূর জীবনকে যেভাবে আকর্ষণীয় ও রোমান্টিক করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এই জীবন থেকে বেরিয়ে আসা সাবেক নারীরা। তাঁদের মতে, পর্দার পেছনের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বিবাহবিচ্ছেদের পর এসব নারীরা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন।
৫৩ বছর বয়সী স্ট্যাসি অ্যাকুইনো বলেন, "ট্রেড ওয়াইফ শব্দটি জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি এই জীবন যাপন করেছি।" ১৯ বছর বয়সে বিয়ে এবং ২১ বছর বয়সে প্রথম সন্তানের মা হওয়া অ্যাকুইনো তাঁর বাবার রেস্তোরাঁয় কিছুদিন কাজ করেছিলেন। কিন্তু স্বামী পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি পুরোপুরি গৃহিণী হয়ে যান। তাঁর স্বামী চাননি তিনি চাকরি করুন। ছয় সন্তানকে বড় করা অ্যাকুইনো বলেন, "আমার সন্তানদের জন্য সবসময় ঘরে থাকাটা আনন্দের ছিল, কিন্তু পেছনে তাকালে নিজের সরলতা আর একাকীত্ব আমাকে ভাবায়।" সন্তানরা বড় হওয়ার সাথে সাথে অ্যাকুইনো নিজের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করেন। ৪০ বছর বয়সে তিনি উপলব্ধি করেন যে তাঁর জীবন যেভাবে কেটেছে তা নিয়ে তিনি মোটেও সুখী ছিলেন না। তাঁর স্বামী কাজের সূত্রে প্রচুর ভ্রমণ করতেন এবং ইতিমধ্যে ঘরের বাইরে অ্যাকুইনোর নিজের কোনো জীবন গড়ে ওঠেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন তরুণীদের এই জীবন বেছে নিতে উৎসাহিত করা হয়, তখন তাঁর গা শিউরে ওঠে।
৪৩ বছর বয়সী এনিটজা টেম্পলটনও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। সম্প্রতি টিকটকে দেওয়া তাঁর একটি সতর্কবার্তামূলক ভিডিও ২ মিলিয়নেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। টেম্পলটন বলেন, "একটি পরিবারের জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার আগে ভাবুন আপনি কোন পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। শিক্ষা এবং স্বাধীন জীবনের গুরুত্ব অনুধাবন করা জরুরি।" ইভানজেলিক্যাল ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন পুয়ের্তো রিকান পরিবারে বেড়ে ওঠা টেম্পলটন ২৬ বছর বয়সে বিয়ে করেন এবং চার সন্তানের মা হন। কিন্তু তিনি কখনো সুখী হতে পারেননি।
বিবাহবিচ্ছেদের আগে অ্যাকুইনো ও টেম্পলটন দুজনেই বুঝতে পারেন যে, বছরের পর বছর ঘরের কাজ করলেও তাঁদের নিজস্ব কোনো আয় বা জীবনবৃত্তান্তে লেখার মতো পেশাদার অভিজ্ঞতা ছিল না। অ্যাকুইনো বলেন, "আমি নিজেকে অত্যন্ত অরক্ষিত অবস্থায় রেখেছিলাম। এটি ছিল ২৪/৭ একটি চাকরি, যা আমি একা কোনো সাহায্য ছাড়াই করেছি। এটি মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়, কারণ এর ফলে পরিবারে একটি অস্বাস্থ্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হয়।"
"দ্য পাওয়ার পজ" বইয়ের লেখক নেহা রুচ বলেন, গৃহস্থালি ও সন্তান লালন-পালনের কাজকে কেবল "ডায়াপার বদলানো ও কাপড় ধোয়া" হিসেবে ছোট করে দেখা হয়, অথচ এর পরিধি অনেক বড়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সোশ্যাল মিডিয়ার "ট্রেড ওয়াইফ" কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা আসলে এই ভিডিওগুলো বানিয়ে নিজেরা আয় করছেন, যা এক বড় পরিহাস।
পারিবারিক আইনজীবী ও ‘মাই ডিভোর্স সলিউশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ক্যাথরিন শানাহান বলেন, সন্তান নেওয়ার আগেই দম্পতিদের আর্থিক বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা করা উচিত। অ্যাকুইনো, যিনি পরবর্তীতে আবার বিয়ে করেছেন, তরুণীদের বিয়ের আগে 'প্রেনাপ' বা বিবাহ-পূর্ব চুক্তি করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, "হয় আপনাকে শুরুতে আলোচনা করতে হবে, না হয় একদম শেষে গিয়ে ভুগতে হবে।"
তবে সবাই এই জীবনের বিরোধী নন। জেসমিন ডার্ক নামের এক ইনফ্লুয়েন্সার ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন যে তিনি ঘরে থেকে সন্তান মানুষ করতে ভালোবাসেন, তবে তিনি চান না তাঁর কন্টেন্ট দেখে অন্য কেউ প্রভাবিত হোক।
টেম্পলটন ও অ্যাকুইনো বিশ্বাস করেন, ট্রেড ওয়াইফ জীবন ও বৈবাহিক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসাটাই তাঁদের ও সন্তানদের জন্য সেরা সিদ্ধান্ত ছিল। অ্যাকুইনো বলেন, "আটকে আছেন মনে করে কোথাও পড়ে থাকা ঠিক নয়। এটি কারও জন্যই ভালো নয়, এমনকি সন্তানদের জন্যও এটি কোনো স্বাস্থ্যকর উদাহরণ হতে পারে না।"
