প্রচুর প্রশংসা ও পুরস্কার ঝুলিতে পুরে অস্কার জয়ের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে স্প্যানিশ চলচ্চিত্র ‘লা বোলা নেগ্রা’। যুদ্ধ, বৈষম্য ও সমকামী প্রেমকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে সোনালি পরচুলা পরা পেনেলোপে ক্রুজ ও স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলা গ্লেন ক্লোজের চমকপ্রদ উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছে। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা জুটি হাভিয়ের আমব্রোসি ও হাভিয়ের কালভো—যাঁরা নিজ দেশ স্পেনে এক নামে ‘লস হাভিস’ নামে পরিচিত—তাঁদের এই ড্রামাটিক সৃষ্টিকে স্রেফ একটি বিশেষ ধারার ছবি হিসেবে দেখতে চাননি।
চলচ্চিত্রটির ব্যাপকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পরিচালক হাভিয়ের আমব্রোসি বলেন, এলজিবিটিকিউ+ বিষয়ক চলচ্চিত্রগুলো কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক, তা তিনি চাননি। তাঁদের ইচ্ছা ছিল যুদ্ধভিত্তিক সবচেয়ে বড় সমকামী সিনেমা তৈরি করা। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের পটভূমির সঙ্গে ডেটিং অ্যাপ গ্রিন্ডারের আধুনিক অনুষঙ্গ মিলিয়ে তৈরি এই চলচ্চিত্রে চোখধাঁধানো ভিশন ফুটে উঠেছে। ইতালীয় ফ্যাসিবাদীদের হাতে একটি স্প্যানিশ গ্রাম বোমার আঘাতে ধ্বংস হওয়ার শুরুর দৃশ্যটির কথা উল্লেখ করে আমব্রোসি বলেন, মানুষ পপকর্ন হাতে নিয়ে ‘টাইটানিক’-এর মতো বিশাল কোনো চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা চাইছিল। এটি মূলত ‘গে টাইটানিক’।
লন্ডনের একটি হোটেলের রেস্তোরাঁয় শীতের সকালে আয়োজিত সাক্ষাৎকারে দুই নির্মাতার মধ্যে দারুণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ৪২ বছর বয়সী আমব্রোসি বাচাল ও কোঁকড়ানো চুলের অধিকারী, অন্যদিকে ৩৫ বছর বয়সী কালভো লম্বা ও বেশ সুদর্শন। প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে বাঁচতে দুজনকেই বার বার খালি হাত ঘষতে দেখা যায়, যতক্ষণ না সহকারী এসে তাঁদের হুডি পরিয়ে দেন। ছবিটির কারণে বিশ্বজুড়ে দর্শকদের আবেগী প্রতিক্রিয়া এখন সামাজিক মাধ্যম টিকটকে বেশ জনপ্রিয়। টিকটকে দর্শকেরা ছবিটি দেখার আগের ও পরের কান্নাভরা কোলাকুলির ভিডিও পোস্ট করছেন। প্রেক্ষাগৃহের এই অভিজ্ঞতাকে বজায় রাখতে নেটফ্লিক্সে আসার আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমা হলগুলোতে ৪৭ দিনের জন্য ছবিটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা এই স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটির ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড।
অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা এই জুটি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে একসঙ্গে সমকামী ও রূপান্তরকামী চরিত্র নিয়ে নাটক ও চিত্রনাট্য লিখেছেন। ২০১৭ সালে তাঁদের প্রথম চলচ্চিত্র ‘হোলি ক্যাম্প!’ মুক্তি পায়, যা ছিল একটি সামার ক্যাম্পের নানদের গল্প নিয়ে তৈরি মঞ্চনাটকের রূপান্তর। ২০২৩ সালে তাঁদের বহুল আলোচিত সিরিজ ‘লা মেসিওস’ মুক্তি পায়। তবে সমকামী পুরুষদের কেন্দ্র করে বড় কোনো কাজ এটিই প্রথম। ছবিটির ১৯৩২ সালের একটি পর্বে দেখা যায়, ক্যাসিনোর অভিজাত সদস্যরা নতুনদের জায়গা দিতে সাদা ও কালো বল ব্যবহার করে ভোট দিচ্ছেন। ভেটো হিসেবে ব্যবহৃত এই কালো বল বা ‘লা বোলা নেগ্রা’ মূলত এক প্রজন্মের সমকামীদের লজ্জা ও প্রত্যাখ্যানের প্রতীক হয়ে উঠেছে। আমব্রোসি স্বীকার করেন, নিজের যৌনতা বা ইচ্ছা প্রকাশ করতে তিনি নিজেও একসময় মানসিকভাবে লজ্জা পেতেন।
ছবিটিতে সমকামী চরিত্রে সত্যিকারের সমকামী অভিনয়শিল্পীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রেমাবিষ্ট এক সেনার চরিত্রে প্রথমবার অভিনয় করেছেন গায়ক গিতারিকাদেলফুয়েন্তে। যদিও সোজা বা স্ট্রেইট অভিনেতারা সমকামী চরিত্রে অভিনয় করতে পারবেন না এমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম শিল্পে নেই বলে জানান কালভো, তবে আমব্রোসি মনে করেন এতে এক ধরণের সত্যতা বজায় থাকে। ১০ বছর বয়সে ‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস ওয়েডিং’ ছবিতে অভিনেতা রূপাট এভারেটকে দেখে তিনি যে সাহসিকতা পেয়েছিলেন, তা স্মরণে রেখে তিনি বলেন, রূপাট এভারেট এতটাই সাহসী ছিলেন যে তাঁর জেমস বন্ড হওয়া উচিত ছিল।
নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে কালভো বলেন, কৈশোরে টিভিতে একটি গে চরিত্রে অভিনয় করার পর তিনি আর নতুন চরিত্র পাচ্ছিলেন না। তাকে চুল ছোট করা বা নখে রঙ না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই যেসব অভিনেতা ইন্ডাস্ট্রিতে সুযোগ পান না, তাঁদের জন্য চিত্রনাট্য লেখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একসঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি প্রেম শুরু করার পর ‘লস হাভিস’ স্পেনের সংস্কৃতিতে এক জনপ্রিয় জুটিতে পরিণত হন। তাঁরা একাধারে নাটক রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, নির্মাতা ও রিয়েলিটি শো ‘রু পলস ড্র্যাগ রেস’-এর নিয়মিত বিচারক। তবে অতিরিক্ত জনপ্রিয়তা ও জুটির পরিচয়ে নিজের স্বকীয়তা হারানোর অনুভূতির কারণে ‘লা বোলা নেগ্রা’ নির্মাণের সময় তাঁদের সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে।
সব মাধ্যম ঘুরে এখন কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণেই মনোনিবেশ করতে চান দুই পরিচালক। তাঁদের মতে, জীবনকে শক্ত কোনো কাঠামোয় না বেঁধে নমনীয় ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। ছবিটির একটি দৃশ্যে আধুনিক যুগের গবেষক আলবের্তোকে উদ্দেশ্য করে গ্লেন ক্লোজ অভিনীত চরিত্রটি বলে, “তুমি এমন কিছু উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছ যা নিয়ে কী করবে বুঝতে পারছ না, তুমি সত্যিই একজন স্প্যানিয়ার্ড।” কালভো ব্যাখ্যা করেন, স্পেনের নিজস্ব সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রায়ই বিদেশিদের কাছ থেকে স্মারক পেতে হয়। আমব্রোসি যোগ করেন, ফুটবল ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়াকে স্প্যানিশরা খুব একটা ‘স্প্যানিশ ভাবমূর্তি’ বলে মনে করে না। এই মানসিকতার মূল হয়তো অতীতের ধর্মীয় প্রভাব কিংবা দীর্ঘ স্বৈরশাসনের ইতিহাসের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে।

