গাজায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণের নতুন প্রস্তাবটি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। এই নতুন চুক্তির মূল ভিত্তি হলো, হামাস তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং বিনিময়ে ইসরায়েল গাজার যে ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে দখল করে আছে, সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। যদিও বিষয়টি শুনতে সহজ মনে হয়, কিন্তু বাস্তব রাজনীতি, যুদ্ধের ভয়াবহতা, পারস্পরিক চরম অবিশ্বাসের অভাব এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।
গাজায় বর্তমানে ২ মিলিয়নেরও বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক চরম দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করছেন। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল গাজায় ২০,০০০-এর বেশি শিশুকে হত্যা করেছে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের পুরো সময়ে ৭০,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং যুদ্ধবিরতির পর আরও ১,০০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অনেক ফিলিস্তিনি ও জর্ডান-মিশরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ধারণা, ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের একটি অংশ ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করার পরিস্থিতি তৈরি করছে।
ইসরায়েলিদের মধ্যেও হামাসকে নিয়ে চরম উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির ৮০ শতাংশ ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করে, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা একটি বড় হুমকি। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করার ঘটনার পর অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, সুযোগ পেলে হামাস আবারও একই ধরনের হামলা চালাতে পারে।
এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পেছনে রয়েছে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অক্টোবরের শেষে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচন নিয়ে চাপের মুখে আছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিচার চলছে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা তার জন্য অস্তিত্বের লড়াই। একইসাথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার রাজনৈতিক সাফল্যের জন্য গাজায় একটি ইতিবাচক ফলাফল খুঁজছেন।
হামাসও বর্তমানে চরম চাপের মুখে। তাদের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ও হাজার হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবুও তারা নতুন করে তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থন পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। হামাসের নতুন রাজনৈতিক নেতা খলিল আল-হাইয়া এই নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবের খসড়া নিয়ে আপত্তির জায়গাগুলো সরিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মিশর ও তুরস্ক বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে।
তবে এই প্রক্রিয়া সফল হওয়া নির্ভর করছে ধাপে ধাপে আস্থা তৈরির ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, যদি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পথ না দেখানো হয়, তবে এই সংঘাত আরও এক প্রজন্মকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে। বর্তমানে পশ্চিম তীরেও সহিংসতার মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে; এসিএলইডি (ACLED)-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালটি পশ্চিম তীরে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে সহিংস বছর হতে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। বিশেষ করে ইসরায়েলি সরকারের চরমপন্থী মন্ত্রীদের ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের বিরোধী অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

