২২ বছর বয়সী অ্যারিয়ানা হার্নান্দেজের সাম্প্রতিক ভ্রমণ তালিকার দিকে তাকালে মনে হতে পারে এটি কোনো ধনী অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির ভ্রমণসূচি। অস্ট্রিয়া, ইতালি, কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, হাওয়াই এবং ভার্জিন আইল্যান্ডস—সবখানেই ঘুরে এসেছেন তিনি। তার এই বিলাসবহুল ভ্রমণের সঙ্গী হয়েছেন তার কিছু বন্ধুও। তবে এই তরুণদের এত অর্থ ব্যয়ের পেছনের মূল রহস্যটি হলো, তারা সবাই এখনো তাদের বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করছেন। হার্নান্দেজ বলেন, "আমার কাছের বান্ধবীদের অনেকেই বাবা-মায়ের সাথে থাকে এবং আমরা একসাথে ঘুরতে পছন্দ করি। বাড়ি ভাড়ার পেছনে আমাদের কোনো খরচ না থাকায় আমরা অনায়াসেই এই ভ্রমণগুলোর খরচ মেটাতে পারছি।"
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এক রেকর্ড সংখ্যক তরুণ নিজেদের স্বাধীন বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়ার জটিল হিসাব-নিকাশ এড়িয়ে বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন। "ক্লেভার রিয়েল এস্টেট" (Clever Real Estate) নামক একটি সংস্থার নতুন জরিপ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় অর্ধেকই পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বদলে বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে গেছেন। এছাড়া, রিয়েলটর ডটকম (Realtor.com)-এর জুন মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩৫ বছরের কম বয়সী ২৫ মিলিয়নেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ তাদের বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই বয়সীদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সাথে থাকার সর্বোচ্চ রেকর্ড, যা কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের চেয়েও অনেক বেশি।
ড্যালাসের বাসিন্দা হার্নান্দেজ গত বছর কলেজ শেষ করে তার বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে আসেন। তিনি বর্তমানে একটি স্ব-গতিসম্পন্ন (self-paced) প্রোগ্রামে পড়াশোনা শেষ করছেন এবং ফুল-টাইম সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে কাজ করছেন। টিকটকে নিজের জীবন ও ভ্রমণ নিয়ে নিয়মিত পোস্ট করা হার্নান্দেজ জানান, "আমি ভেবেছিলাম, বাবা-মায়ের সাথে থাকলে বাড়ি ভাড়ার টাকাটা বাঁচিয়ে আমি অনায়াসে ভ্রমণ করতে পারব।" তাছাড়া বাবা-মায়ের সাথে থাকার আরেকটি বড় সুবিধা হলো, তাকে খুব কমই বাজার করতে হয়। তার বাবা-মা সবসময় খাবার তৈরি রাখেন এবং বাইরে ডেটে গেলে প্রায়ই তার জন্যও খাবার নিয়ে আসেন।
হার্নান্দেজের মতে, বাবা-মায়ের সাথে থাকাটা এখন তরুণদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, "বাবা-মায়ের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার পরও কোনো বন্ধুকে একা একা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকতে দেখলে আমি বরং অবাকই হব। একা একা অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে থাকার এখন আসলে কোনো মানেই হয় না।"
ক্লেভার-এর জরিপে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক কলেজ গ্র্যাজুয়েটদের অর্ধেকই এখনো আর্থিক সহায়তার জন্য বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি ২৫ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট জানিয়েছেন, তাদের সব ধরনের বিল বাবা-মা পরিশোধ করেন। গত জুন মাসে ৫৬৪ জন বর্তমান কলেজ শিক্ষার্থী এবং গত পাঁচ বছরে ডিগ্রি অর্জনকারী ৪৩৬ জন গ্র্যাজুয়েটের ওপর এই জরিপ চালানো হয়।
তবে বাবা-মায়ের সাথে একসাথে থাকার বিষয়ে তরুণদের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। জরিপকৃত বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ জানিয়েছেন তারা পড়াশোনা শেষে শৈশবের বাড়িতে ফিরে যেতে চান, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ৪৯ শতাংশ গ্র্যাজুয়েটই সেখানে ফিরে গেছেন। ক্লেভার-এর ডেটা অ্যানালিস্ট ক্লারা হ্যাভারস্টিক বলেন, "যখন আপনি বাবা-মায়ের সাথে থাকবেন, তখন পৃথিবীতে নিজের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করাটা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।"
মহামারির সময়ে তরুণরা কোয়ারেন্টিন ও শহরের ভিড় এড়াতে বাবা-মায়ের কাছে ফিরলেও, এখন মূলত অতিরিক্ত আবাসন খরচের কারণে তারা ঘরে থাকছেন। রিয়েলটর ডটকম-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে একটি বাড়ির গড় মূল্য ৪,৩০,০০০ ডলার, যা ২০১৯ সালের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে গড় বাড়ি ভাড়া ১৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৬৭৩ ডলারে। হ্যাভারস্টিক বলেন, "আমাদের শেখানো হয় যে একজন সফল প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষণ হলো নিজের একটি বাড়ি থাকা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েটের পক্ষে বাড়ি কেনা অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন।" গত এক দশকে আয়ের চেয়ে বাড়ির দাম অনেক দ্রুত বেড়েছে, যার সাথে উচ্চ সুদের হার যোগ হয়ে লাখ লাখ তরুণের জন্য বাড়ি কেনার স্বপ্ন অসম্ভব করে তুলেছে।
তবে অনেকে আর্থিক সংকটের বাইরেও আবেগগত কারণে বাড়িতে ফিরে আসেন। যেমন ২৫ বছর বয়সী ক্লারা হ্যাভারস্টিক নিজে কলেজ শেষ করার পর মিসৌরির দক্ষিণ-পশ্চিমে তাদের পারিবারিক খামারে ফিরে যান। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল পাশের বাড়িতে থাকা তার দাদির সাথে সময় কাটানো। তিনি বলেন, "সকালে একসাথে কফি খাওয়া বা ডিনারের জন্য শহরে যাওয়ার মতো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চমৎকার ছিল। আমরা একসাথে ফুটবল খেলাও দেখতাম।" গত বছরের অক্টোবরে ক্লারার দাদি কারিন হ্যাভারস্টিক মারা যান। ক্লারা বলেন, "সময় থাকতে সেখানে পাশে থাকাটা আমার জন্য খুব জরুরি ছিল।"
