জার্মানির বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (বিএনডি) সাবেক প্রধান অগাস্ট হ্যানিংকে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার ও দেশদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির ফেডারেল প্রসিকিউটর অফিস জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার জার্মানির দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকা বাড টোলজ-ভলফ্রাটশাওসেন থেকে ৮০ বছর বয়সী হ্যানিংকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিএনডি-র প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
হ্যানিংয়ের পাশাপাশি তাঁর এক সাবেক সহকারী ম্যানফ্রেড ডি.-কেও জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলীয় স্টেইনফুর্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ম্যানফ্রেডের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার চেষ্টা এবং গুপ্তচরবৃত্তিতে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, ম্যানফ্রেড প্রথমে হ্যানিংয়ের চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিএনডি-র পরবর্তী কয়েকজন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর কাছে অত্যন্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল নথির প্রবেশাধিকার ছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, ২০১০ সালে হ্যানিং ও ম্যানফ্রেড একটি চুক্তিতে পৌঁছান। সেই চুক্তি অনুযায়ী, অর্থের বিনিময়ে ম্যানফ্রেড নিয়মিত বিএনডি-র গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন তথ্য হ্যানিংয়ের কাছে পাঠাতেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ম্যানফ্রেড প্রায় ২,০০০টি নথি হ্যানিংকে সরবরাহ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব নথির বেশিরভাগই ছিল অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা তথ্য, যা মূলত নির্বাহী গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
অভিযোগ উঠেছে, হ্যানিং এই তথ্যগুলো তাঁর ব্যক্তিগত পরামর্শক (কনসাল্টিং) ব্যবসায় ব্যবহার করেছিলেন। এমনকি একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার জন্য বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন তৈরিতেও তিনি এই গোপন তথ্য ব্যবহার করেছেন। এছাড়া হ্যানিং অন্য একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন এবং ম্যানফ্রেডের দেওয়া নথির ওপর ভিত্তি করে কয়েক বছর ধরে তাঁকে রাজনৈতিক তথ্য সরবরাহ করেছেন। তবে তাঁরা ঠিক কোন দেশের জন্য এই গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন, তা প্রসিকিউটর অফিস থেকে এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
নাটকীয় বিষয় হলো, এই গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়টি সামনে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হামবুর্গের ব্যবসায়ী ক্রিস্টিনা ব্লকের সন্তানদের ডেনমার্ক থেকে তাঁর সাবেক স্বামীর কাছ থেকে অপহরণের একটি ঘটনা ঘটে। ২০২২ সালে একটি নিরাপত্তা সংস্থার নির্বাহী হিসেবে কাজ করার সময় ক্রিস্টিনা ব্লকের কাছ থেকে সন্তানদের অপহরণের চুক্তি নেওয়ার অভিযোগ ওঠে হ্যানিং এবং হামবুর্গ রাজ্য অপরাধ তদন্ত বিভাগের এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সেই মামলার সূত্রে হ্যানিংয়ের বাড়িতে তল্লাশি চালাতে গিয়েই এই গুপ্তচরবৃত্তির অকাট্য তথ্য খুঁজে পান গোয়েন্দারা, যা শেষ পর্যন্ত এই গ্রেপ্তারে রূপ নেয়।
এই ঘটনায় জার্মান রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গ্রিনস পার্টির সংসদ সদস্য এবং গোয়েন্দা নজরদারি কমিটির সদস্য কনস্ট্যান্টিন ফন নটজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি অত্যন্ত গুরুতর এবং উদ্বেগজনক একটি ঘটনা। তিনি সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হ্যানিংয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের দ্রুত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তিনি নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাওয়া সাবেক কর্মকর্তাদের অবসরের পর ব্যক্তিগত পরামর্শক হিসেবে কাজ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানান। এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য বিএনডি-র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

