২০২৪ সালের এমটিভি ভিডিও মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসে (ভিএমএ) দক্ষিণ আফ্রিকান পপ তারকা টাইলা যখন সেরা 'অ্যাফ্রোবিটস' পুরস্কারটি গ্রহণ করছিলেন, তখন তার মনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। হলুদ পোশাকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের হিট গান 'ওয়াটার'-এর বৈশ্বিক সাফল্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এটি প্রমাণ করে যে আফ্রিকান গানও মূলধারার পপ সঙ্গীত হতে পারে। তবে পরক্ষণেই তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আফ্রিকার সমস্ত সঙ্গীতকে কেবল 'অ্যাফ্রোবিটস' হিসেবে চিহ্নিত করার একটি প্রবণতা রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বাসিন্দা এবং তার গান মূলত 'অ্যামাপিয়ানো' ঘরানার। এর কয়েক মাস পর আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসেও তাকে একই বিভাগে পুরস্কৃত করা হয়।
টাইলাই একমাত্র শিল্পী নন যিনি এই 'অ্যাফ্রোবিটস' তকমার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। নাইজেরীয় সংগীতশিল্পী টেমস এই তকমা প্রত্যাখ্যান করে তার সঙ্গীতকে 'অ্যাফ্রো, আরঅ্যান্ডবি, সোল ও অল্টারনেটিভ'-এর মিশ্রণ বলে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে বার্না বয় তার সঙ্গীতকে 'অ্যাফ্রোফিউশন' বলতে পছন্দ করেন। উইজকিড, সিকে, কিং প্রমিজ এবং ডেভিডোর মতো জনপ্রিয় শিল্পীরাও এই সাধারণীকরণের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তা সত্ত্বেও পশ্চিমা সঙ্গীত বাজারে এই তকমাটি এখনও টিকে রয়েছে এবং আফ্রিকান সঙ্গীতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
২০১০-এর দশকের শুরুতে পশ্চিম আফ্রিকার সমসাময়িক নৃত্য সঙ্গীত—যেমন ডি'বাঞ্জের 'অলিভার টুইস্ট' যখন ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই ধারাকে চিহ্নিত করতে 'অ্যাফ্রোবিটস' শব্দটির উৎপত্তি হয়। লন্ডনের ডিজে অ্যাব্রান্টি কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ফেলা কুটির 'অ্যাফ্রোবিট' শব্দের সাথে একটি 'এস' যুক্ত করে রেডিও এবং স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে এই সঙ্গীত বিপণনের একটি সহজ উপায় তৈরি করেন। সম্প্রতি টাইলার 'ওয়াটার', রেমার 'কাম ডাউন' বা মলির 'শেক ইট টু দ্য ম্যাক্স'-এর মতো গানগুলো বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে আফ্রিকার পপ, র্যাপ, আরঅ্যান্ডবি, গসপেল ও হাইলাইফ সহ সব ধরনের সঙ্গীতকেই এই একটি তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
টাইলার সাথে চলতি অক্টোবরে ট্যুরে যাওয়া নাইজেরীয় প্রযোজক ও গায়ক ব্লাডি সিভিলিয়ান এই শ্রেণীকরণকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ এবং বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন। তিনি বলেন, আফ্রিকানরা যেভাবে শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে সেগুলোকে একটি বাক্সে বন্দি করতে চাইছে তা সত্যিই হতাশাজনক। এর একটি বড় উদাহরণ হলো মিস্টার ইজির 'বাঙ্কু মিউজিক', যা নাইজেরীয় পপ ও ঘানার হাইলাইফের সংমিশ্রণে তৈরি হয়েছিল। ২০১৫ সালে এই ধীরগতির ও স্বতন্ত্র তালের সঙ্গীতটি পশ্চিম আফ্রিকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। রানটাউন ও টেকনোর মতো শিল্পীরাও এই ধারা অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমা বাজারে এটিকে আলাদা ঘরানা হিসেবে তুলে না ধরায় এটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। একই পরিণতি হয়েছে আজোন্টো, জাঙ্কু, ক্রুজ ও অ্যাফ্রোপিয়ানোর মতো চমৎকার সব ঘরানার।
সংস্কৃতি বিষয়ক সাংবাদিক তিলেওয়া কাজিম বলেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো প্রায়শই এই নতুন ধারাগুলোকে জটিল বা দুর্বোধ্য মনে করে। ফলে এগুলো যথাযথভাবে নথিবদ্ধ বা সংরক্ষণ করা হয় না। এমনকি এ বছর এমটিভি ভিএমএ থেকে অ্যাফ্রোবিটস বিভাগটি বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো নতুন আফ্রিকান বিভাগ যুক্ত করা হয়নি। নাইজেরীয় সঙ্গীত নেটওয়ার্ক 'উইটকসাউন্ড'-এর প্রতিষ্ঠাতা দোলাপো আমুসাত মনে করেন, 'আফ্রো আদুরা' বা 'মারা'র মতো নতুন ধারাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে এগুলোর প্রচার ও সংরক্ষণে আরও আন্তরিক হতে হবে। সংস্কৃতি লেখক ডেনিস অ্যাডে পিটার শিল্পীদের দ্বিচারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, শিল্পীরা এই তকমার বিরোধিতা করলেও পুরস্কার গ্রহণের সময় বা বিপণনের ক্ষেত্রে ঠিকই এটি ব্যবহার করছেন। কৃষ্ণাঙ্গ লেখিকা বেল হুকস তার 'আর্ট অন মাই মাইন্ড' প্রবন্ধে যেমনটি লিখেছিলেন, কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পকলার সঠিক মূল্যায়নের জন্য শিল্পীদের নিজেদেরও সোচ্চার হতে হবে। ফেলা কুটি বা কিং সানি আদের মতো নতুন প্রজন্মকেও তাদের নিজস্ব সঙ্গীতধারা প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

