প্রযুক্তির ওপর অত্যধিক নির্ভরতার কারণে দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইকেল চালানো বা গাড়ি ড্রাইভ শেখার মতোই স্মৃতিশক্তি একটি চর্চাযোগ্য দক্ষতা, যা অনুশীলনের মাধ্যমে যেকোনো বয়সেই ধারালো করা সম্ভব। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে অল্প বয়সেই অনেকের স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা নিজস্ব মস্তিষ্ক ব্যবহারের অভ্যাস বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন, কারণ অনেকেই এখন নিজের বা জরুরি যোগাযোগের নম্বর পর্যন্ত মনে রাখতে পারেন না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ফিউচারিস্টিক লার্নিং'-এর প্রতিষ্ঠাতা সানিয়া আলম ছয়টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ভঙ্গকারী মেমোরি অ্যাথলেটদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তিনি জানান, বর্তমানে মানুষ বিপুল তথ্যের স্রোতে ডুবে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তারের ফলে মস্তিষ্কের বয়স দ্রুত বাড়ছে এবং খুবই কম বয়সেই অনেকে স্মৃতিভ্রমের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি মস্তিষ্কের জন্য নির্ধারিত মেমোরি কৌশল শেখার ওপর জোর দেন, যাতে গ্যাজেটের নির্ভরতা কাটিয়ে নিজের মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখা যায়।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যার অধ্যাপক এবং 'ব্রেন বুস্ট: হেলদি হ্যাবিটস ফর এ হ্যাপিয়ার লাইফ'-এর সহ-লেখক বার্বারা সাহাকিয়ান মনে করেন, নতুন বিষয় শেখা এবং মানসিকভাবে উদ্দীপক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকাই স্মৃতিশক্তি উন্নত করার সেরা উপায়। ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত মার্টিন ওরেল ও তার একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝেইমার্সের ঝুঁকি কমাতে নতুন কিছু শেখার কোনো বিকল্প নেই, যাকে বলা হয় 'ব্যবহার করুন অথবা হারান'। নতুন শিক্ষা ও স্মৃতি চর্চার ফলে নিউরাল সার্কিট সতেজ থাকে। লন্ডনের ব্ল্যাক-ক্যাব ট্যাক্সি চালকদের রুটের পথ মনে রাখা এবং মেডিকেল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় করা গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের 'হিপোক্যাম্পাস' অংশের আয়তন প্রকৃতপক্ষে বৃদ্ধি পায়।
মনোযোগের ঘন ঘন পরিবর্তনও স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অধ্যাপক সাহাকিয়ান জানান, আধুনিক প্রযুক্তি মনোযোগ দ্রুত এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে ঘুরিয়ে দেয়, যা লক্ষ্য অর্জনে একাগ্রতা নষ্ট করে। গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখা শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ ফল করে। এমনকি ফোন বন্ধ করে পাশে রেখে দিলেও তা মনোযোগের বিচ্যুতি ঘটায়।
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের মেমোরি চ্যাম্পিয়ন কেটি কারমোডে ২০০৮ সাল থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন এবং মানুষের নাম মনে রাখার বিশ্বরেকর্ডসহ অসংখ্য খেতাব জিতেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে স্মৃতি ধরে রাখা কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, বরং নির্দিষ্ট কৌশলের খেলা। নয় বছর বয়সে সৌরজগতের গ্রহগুলোর নাম অনুক্রমে মনে রাখার জন্য তিনি 'জার্নি টেকনিক' শেখেন। এই পদ্ধতিতে যেকোনো তথ্যকে গল্প বা বস্তুর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়—যেমন থার্মোমিটার ভেঙে পারদ (মার্কারি) ছড়িয়ে পড়া, দেবী ভেনাস তা কুড়িয়ে ব্যাগে নিয়ে ফেলে দেওয়া এবং তা পৃথিবীতে এসে পড়া। কারমোডে জানান, প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার সংখ্যা মনে রাখার জন্য তিনি নিজেকে বারবার পড়ে শেখার পরিবর্তে এমন ভিজ্যুয়াল স্টোরি ও অনুষঙ্গ তৈরির কৌশল ব্যবহার করেন।
কারমোডের কাছে তারিখ মনে রাখার জন্য আলাদা কৌশল রয়েছে, যেখানে প্রতিটি মাস একটি নির্দিষ্ট অর্থ বা রঙের নির্দেশক এবং প্রতিটি দিন একটি বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে। তবে নির্দিষ্ট কোনো জন্মদিনে বাস্তবে কিছু করার কথা মনে রাখা মস্তিষ্কের অন্য অংশের কাজ বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিমূর্ত ধারণা মনে রাখতে তিনি প্রতীক ব্যবহারের পরম পরামর্শ দেন; যেমন অক্টোবর মাস মনে রাখতে কুমড়োর ছবি আর দুই সংখ্যার জন্য হাঁসের ছবি ভেবে ২ অক্টোবরকে 'কুমড়োর ওপর বসে থাকা হাঁস' হিসেবে কল্পনা করা। যারা দৃশ্য কল্পনা করতে পারেন না, তারা গল্পে একাধিক মানুষকে যুক্ত করে স্মৃতি ধরে রাখতে পারেন।
পড়াশোনা ও রিভিশনের জন্য 'অ্যাক্রোনিম' বা সংক্ষেপণ কৌশল বেশ কার্যকর বলে জানান সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সাবেক সিনিয়র লেকচারার এবং 'লিংকওয়ার্ড ল্যাঙ্গুয়েজেস'-এর প্রতিষ্ঠাতা ৮৬ বছর বয়সী ড. মাইকেল গ্রুনবার্গ। যেমন আলোক বর্ণালীর রঙের ক্রম মনে রাখতে ইংরেজিতে "Richard of York gave battle in vain" বাক্যটি বহুল ব্যবহৃত। পরীক্ষার পড়া মনে রাখতে তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ের মূল পয়েন্টগুলোর প্রথম অক্ষর দিয়ে শব্দ বা বাক্য তৈরির পরামর্শ দেন।
এছাড়া শেখার বিষয়গুলো দীর্ঘস্থায়ী করতে কারমোডে 'স্পেসড রিপিটিশন' বা নির্দিষ্ট বিরতিতে পর্যালোচনার ওপর জোর দেন। কোনো তালিকা অল্প সময়ের জন্য মনে রাখতে এক-দুবার চোখ বোলানোই যথেষ্ট, তবে দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতে প্রথম সপ্তাহে প্রতিদিন, তারপর কয়েক দিন পর, পরবর্তী সপ্তাহে সপ্তাহে একবার এবং সবশেষে মাসে একবার ঝালাই করার নিয়ম মেনে চলতে হয়। পড়ার সময় মূল বিষয়বস্তুকে কেন্দ্রে রেখে ডালপালা ছড়িয়ে 'মাইন্ড ম্যাপ' তৈরি করলেও তা সহজে মনে থাকে। ফ্ল্যাশকার্ড স্মৃতি পর্যালোচনায় সাহায্য করলেও প্রথমে তথ্য মনে রাখার মূল কৌশল প্রয়োগের পরই তা কার্যকর হয় বলে জানান কারমোডে।
বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে 'প্রসপেক্টিভ মেমোরি' বা ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার কথা মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। ড. গ্রুনবার্গ বলেন, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা প্রয়োজনীয় কাজের সময় লিখে রাখা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। কারমোডে এ ক্ষেত্রে অ্যালার্ম ব্যবহারের পাশাপাশি রুটিন কাজের সঙ্গে নতুন কাজকে যুক্ত করার পরামর্শ দেন; যেমন দুপুরের খাবারের পরই চুল কাটতে যেতে হলে ফ্রিজ খুলতেই কাঁচির কথা মনে করার মতো মানসিক যোগসূত্র তৈরি করা।
স্মৃতি সুসংহত করার জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই। অধ্যাপক সাহাকিয়ান রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমান। সারাদিন যা শেখা হয়, ঘুমের সময় তা মস্তিষ্কে স্থায়ী রূপ নেয়, তাই পরীক্ষার আগের রাতে ঘুম হারাম করে পড়াশোনা করা ক্ষতিকর। কারমোডেও একমত যে ক্লান্ত মস্তিষ্কে দ্রুত কিছু মুখস্থ করা সম্ভব নয়; তিনি একবার প্রতিযোগিতা জিতে বাড়ি ফেরার পর অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে এটিএম বুথে নিজের পিন কোড পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিলেন। সানিয়া আলমও জানান, ঘুম না হলে ব্রেন ফগ তৈরি হয় এবং শরীর তার প্রাকৃতিক মেজাজ হারায়। কোনো কিছু স্থায়ীভাবে মনে রাখতে নিয়মিত হালকা ঘুম বা ন্যাপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যা মস্তিষ্ককে তথ্যগুলো সঠিক স্থানে সাজিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

