রাশিয়ার দখলীকৃত ইউক্রেনের সম্মুখসারির শহর ওলেশকি থেকে উদ্ধার হয়ে উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ অঞ্চলে পৌঁছেছেন শত শত বাসিন্দা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা শুরুর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই এক পাশে দনিপ্রো নদী এবং অন্য পাশে রুশ বাহিনীর ছায়ায় সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল শহরটি।
দীর্ঘ অবরুদ্ধ জীবন ও ভয়াবহ পরিস্থিতি পেরিয়ে বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে ইউক্রেনে প্রবেশের পর স্বজনদের সঙ্গে আবেগঘন পুনর্মিলনে আবদ্ধ হন এসব উদ্ধারকৃত মানুষ। কোচ থেকে নেমে ওলেশকি ছেড়ে আসা ভিয়াচেসলাভ নামের এক ব্যক্তি অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "আমরা যেন সরাসরি জাহান্নাম থেকে ফিরে এসেছি।"
ভিয়াচেসলাভের স্ত্রী ওলহা ওলেশকির গত কয়েক বছরের জীবনযাত্রাকে এক বাক্যে বর্ণনা করেছেন "ভয়াবহতা" বলে। ত্রিশের কোঠায় থাকা ছেলে-মেয়ে এবং পোষা কুকুরকে নিয়ে আসা এই দম্পতি চারপাশে তীব্র গোলাবর্ষণের মধ্যেও শহর ছেড়ে পালানোর দুঃসাহস দেখাননি, কারণ মাইন পুঁতে রাখা পথ আর ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পালিয়ে যাওয়াটাও কম বিপজ্জনক ছিল না। তবে অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রী শেষ হয়ে এলে চলতি মাসের শুরুর দিকে তারা কেবল খাবারের খোঁজে মাইনফিল্ডের মধ্য দিয়ে যাতায়াত শুরু করেন।
ওলহা বলেন, "কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ মাইন মাড়িয়ে মারা যাচ্ছিল এবং পঙ্গু হচ্ছিল।" তিনি আরও জানান, যারা বাইরে বের হতে প্রচণ্ড ভয় পেতেন, তারা বাগানের আগাছা রান্না করে খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি না দেখে অবশেষে শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় খেরসন অঞ্চলে একটি মানবিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ওলেশকিতে কয়েক দিনের জন্য শান্তির পরিবেশ তৈরি হয়, যা বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, ওলেশকি ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে এখনও প্রায় ৬,০০০ মানুষ বসবাস করছেন, যার মধ্যে প্রায় ২০০ জন শিশু রয়েছে এবং কেবল মূল শহরেই রয়েছেন প্রায় ১,৭০০ জন। গত শুক্রবার শহর ছাড়ার জন্য চার ঘণ্টার একটি সময়সীমা পান বাসিন্দারা।
সে সময় প্রায় ৭৫০ জন নাগরিককে সরিয়ে নিতে ২৫টি বাসের একটি কনভয় এবং সীমিত চলাচলের সুবিধাসম্পন্ন মানুষের জন্য অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা হয়। রুশ-অধিকৃত এলাকা থেকে দক্ষিণ রাশিয়া হয়ে বিমানের মাধ্যমে বেলারুশে এবং সেখান থেকে শনিবার বাসে করে চেরনিহিভের একটি সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছান তারা। অনেক প্রবীণ বাসিন্দাকে শারীরিক দুর্বলতার কারণে স্ট্রেচারে করে বহন করতে দেখা গেছে।
চেরনিহিভে গাড়ি এসে পৌঁছানোর পর তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। মিখাইলো পালি নামের এক বৃদ্ধ বাস থেকে নামতেই তার দুই মেয়ে দাশা ও আনিয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরেন। পালি জানান, পরিবারের দুশ্চিন্তা এড়াতে ওলেশকির অনেক ভয়াবহ তথ্য তিনি এতদিন গোপন রেখেছিলেন। তিনি বলেন, "আমাদের বাথরুম গোলার আঘাতে উড়ে গিয়েছিল।
প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলা আর ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানছিল। কিন্তু ওদের চিন্তায় ফেলার ভয়ে আমি কিছুই জানাইনি।" অন্যদিকে, পোষা বিড়াল কোলে নিয়ে চেরনিহিভে পৌঁছানো তেতিয়ানা ও ভোলোদিমির দম্পতি জানান, তিন বছর আগেই তাদের নিজের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।
এরপর তারা প্রতিবেশীর পরিত্যক্ত একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তেতিয়ানা বলেন, "পিছনে ফেলে আসা কিছুর জন্য আমাদের আফসোস নেই। সেখানে আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না; সন্তানরা বিবাহিত এবং তারা শহরের বাইরে থাকে।"
জীবন বাঁচাতে সক্ষম হলেও ওলেশকিতে রয়ে যাওয়া অন্য মানুষদের পরিস্থিতি নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ওলহা। ইউক্রেনে ফিরে আসা এসব মানুষের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ—কোথায় থাকবেন এবং কীভাবে জীবন নতুন করে শুরু করবেন। মিখাইলো পালি জানান, পরিবার চালানোর জন্য তিনি যেকোনো কাজ করতে প্রস্তুত। পালি বলেন, "এমন কোনো কাজ নেই যা আমি পারব না—মাটি খোড়া, কোদাল চালানো, গাছ লাগানো, ঘর নির্মাণ কিংবা ঘরবাড়ি ভাঙার কাজও আমি করতে পারি।" ইউক্রেনের অন্য কোথাও নিজেদের কোনো আত্মীয় না থাকায় ওলহা ও তার পরিবার আপাতত চেনা পরিচিতদের আশ্রয়ে থেকে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন।
ওলহা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "আমরা যদি জাহান্নামে বেঁচে থাকতে পারি, তবে এখানেও ঠিক বেঁচে থাকতে পারব।"

