ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে কয়েক দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে চলায় বেসামরিক বাসিন্দারা ফের যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। প্রায় সাড়ে চার বছর আগে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো যুদ্ধবিরতি। মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় অর্জিত এই সীমিত যুদ্ধবিরতি গত মঙ্গলবার ভোরের দিকে শুরু হয়ে রবিবার সন্ধ্যায় শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এই বিরল যৌথ যুদ্ধবিরতির সুযোগে সম্মুখসারির শহর ওলেশকি থেকে অবরুদ্ধ বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ গত শনিবার শেষ হয়। যুদ্ধবিরতি শুরুর সময় শহরটিতে আনুমানিক ২,০০০ বেসামরিক মানুষ অবস্থান করছিলেন। তাদের ইউক্রেন বা রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকায় চলে যাওয়া কিংবা নতুন খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে শহরেই থেকে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। অবস্থানরতদের নিরাপত্তার স্বার্থে সরিয়ে নেওয়ার পর ঠিক কতজন ওলেশকিতে রয়ে গেছেন, সেই সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। শনিবার ইউক্রেন সীমান্তে স্বজনরা তাদের প্রিয়জনদের অপেক্ষায় ছিলেন, আর পাশের গ্রামের মানুষ জাতীয় পতাকা নেড়ে ও ফ্ল্যাশলাইটের আলো জ্বালিয়ে মানবিক সহায়তার কনভয়কে স্বাগত জানান।
তবে খেরসনে সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ থাকলেও ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় দুই দেশের আকাশপথে হামলা অব্যাহত ছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি রবিবার জানান, শীত আসার আগেই রাশিয়া দেশটির জ্বালানি খাত লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে জেলেনস্কি উল্লেখ করেন, রাতের আঁধারে মস্কোর বিমান হামলায় লাখ লাখ পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া চরম তীব্রতায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “হামলার তীব্রতা অত্যন্ত বেশি, আর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার ঘাটতির সুযোগ সর্বোচ্চ উপায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী।”
সাময়িক যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও খেরসন শহরের বাসিন্দারা রবিবার শান্ত ছিলেন। মাইকোলা কুলিশ খেরসন আঞ্চলিক একাডেমিক মিউজিক অ্যান্ড ড্রামা থিয়েটারের প্রধান ওলেকসান্দর কনিহা এক কনসার্টের উদ্বোধনকালে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “ভয় পাবেন না, শক্ত হয়ে টিকে থাকুন।” থিয়েটারটি প্রতি শনি ও রবিবার শো আয়োজন করে থাকে। স্থানীয় কর্মকর্তারা রুশ বাহিনী নতুন করে অস্ত্র ও সেনাবহর জোরদার করার বিষয়ে সতর্ক করা সত্ত্বেও আগামী সপ্তাহে স্বাভাবিক সূচিতেই নাটক ও কনসার্ট মঞ্চস্থের পরিকল্পনা করেছে দলটির শিল্পীরা। খেরসনে গোলাবর্ষণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হলেও কনিহা জানান, শহরটি গত চার বছর ধরে সম্মুখসারিতে রয়েছে এবং তাদের থিয়েটার কখনো কোনো শো বাতিল করেনি।
বর্তমানে থিয়েটারটি একটি ভূগর্ভস্থ বেজমেন্টে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে এবং তারা অতিরিক্ত বোমা আশ্রয়কেন্দ্র সজ্জিত করছে। এই থিয়েটারের ১২০ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ১০০ জনই খেরসনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাদের কেউ শহর ছেড়ে যাননি। থিয়েটারের ৫৮ বছর বয়সী পোশাক প্রস্তুতকারক আল্লা ভাসイレঙ্কো জানান, এই সংক্ষিপ্ত বিরতির নীরবতাও তাকে আতঙ্কিত করে। তিনি বলেন, “কোনো কিছুই পরিবর্তন হবে না। যুদ্ধবিরতি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, কারণ রুশদের বিশ্বাস করা মানে নিজেকে না বিশ্বাস করা।” ১০টি কুকুর থাকার কারণে শহর ছাড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই তার। তাছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০ হ্রিভনিয়া খরচের প্রয়োজন, যা তার জন্য অনেক বড় অঙ্ক। তিনি যোগ করেন, “যতক্ষণ না আমরা নদীর বাম তীর মুক্ত করছি, ততক্ষন এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।”
কনিহার বাড়ি নদীর দখলীকৃত বাম তীরের ওলেশকিতে, যেখান থেকে আগে তিনি খেরসনে যাতায়াত করতেন। নিজের ভিটায় ফেরার আশা এখনো ছাড়েননি তিনি। যুদ্ধবিরতির শেষ দিনে থিয়েটারটি ইউক্রেনের “সঙ্গীত মানচিত্র” থিমে একটি কনসার্টের আয়োজন করে, যেখানে ২০১৪ সালে রাশিয়া কর্তৃক সংযুক্ত হওয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ থেকে শুরু করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কার্পাথিয়ান পর্বতমালা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলের গান পরিবেশন করা হয়। কনিহা বলেন, “মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আশা জোগানোও আমাদের কাজের একটি অংশ।”
এদিকে ইউক্রেনের কিয়েভ অঞ্চলে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রুশ ড্রোনের হামলায় এক নারী আহত হয়েছেন এবং বেশ কিছু ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও একটি খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী রবিবার জানায়, রাতের হামলায় মস্কো ৪ ৩৩টি ড্রোন ব্যবহার করেছে, যার মধ্যে ৩৭১টি ড্রোন ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার মস্কোর পূর্বাঞ্চলীয় নিজনি নভগোরোদ অঞ্চলের আকাশে ইউক্রেনের ১০০টিরও বেশি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানান আঞ্চলিক গভর্নর গ্লেব নিকিতিন। তিনি জানান, কেস্তোভো শহরের একটি শিল্প ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তীতে রাশিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, হামলায় কেস্তোভো তেল শোধনাগারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এছাড়া ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রবিবার নিশ্চিত করেন যে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা ও বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। জেলেনস্কি লিখেন, “আমরা রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ন্যায্য আত্মরক্ষা করছি এবং তাদের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তা-ই করছি।”

