ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় এবং ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩: ৪৩। শুক্রবার ‘মেট্রোরেলের ব্যয় বৃদ্ধি ও পরিকল্পনায় ন্যায্যতা’ শীর্ষক এক অনলাইন সেমিনারে বক্তারা এই দাবি জানান। তারা বলেন, বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই একের পর এক ব্যয়বহুল মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, যা ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
সেমিনারে জানানো হয়, গত এক দশকে ঢাকার বাসব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে। বিনিয়োগ করার পরও ১,০০০ কোটি টাকার বিআরটি প্রকল্প চালুর কোনো উদ্যোগ নেই, অথচ আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মূল প্রবন্ধে বলেন, মেট্রোরেলের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহের কারণে পরিবহনের অন্যান্য সম্ভাবনাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বাস, বিআরটি ও পথচারীবান্ধব যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে ছয়টি মেট্রোরেলের জন্য ১৪০ কিলোমিটারের বেশি নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫ (উত্তর) প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার অভাবে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত জনগণকে বহন করতে হবে।
পরিবহন পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মামুন বলেন, বর্তমানে মেট্রোরেলের মাধ্যমে প্রায় এক শতাংশ ট্রিপ সম্পন্ন হচ্ছে। সব পরিকল্পিত মেট্রোরেল বাস্তবায়িত হলেও সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ট্রিপ বহন করা সম্ভব হবে। তাই বাকি বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য কার্যকর বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি ড. আরিফুল ইসলাম বড় প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পাশাপাশি অনুমোদিত ব্যয় যৌক্তিক কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আইপিডির রিসার্চ ফেলো আসিফ ইকবাল আকাশ প্রকল্প পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আইপিডি বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত দরপত্র, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বারা ব্যয় যাচাই, দেশীয় প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প অনুমোদনের সময় ২০-৩০ বছরের পরিচালন ব্যয়, ঋণের কিস্তি, সরকারি ভর্তুকি ও সম্ভাব্য টিকিটমূল্যের হিসাব প্রকাশ করা। এছাড়া, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বারবার বাড়ানোর কারণ অনুসন্ধান এবং চুক্তির তথ্য অনলাইনে প্রকাশের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে আইপিডি ঢাকার তিন হাজারের বেশি বিচ্ছিন্ন বাসকে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পাঁচ-ছয়টি প্রাতিষ্ঠানিক কোম্পানির আওতায় আনা, কমিউটার ট্রেন চালু এবং মেট্রো স্টেশন ও বাস টার্মিনালের সঙ্গে ফুটপাত ও সাইকেল লেনের সংযোগ স্থাপনের সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বিআরটি ও লাইট রেলের মতো সাশ্রয়ী বিকল্পের লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।

