যুদ্ধের শুরুর দিনেই বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর মধ্যপ্রাচ্য সদর দফতরে হামলা চালায় ইরান। মার্কিন সরকার সেখানে অবস্থানরত সামরিক পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়ার আগেই এই হামলা চালানো হয়। বেশ কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে তাদের প্রায় এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
এক সেনার স্ত্রী বলেন, "আমরা চরম আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। প্রতিদিন সকালে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শব্দে ঘুম ভাঙত এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শোনা যেত।" অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, যুদ্ধ শুরুর পর বেশ কয়েক দিন ধরে বাহরাইনে অনবরত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
বাহরাইনে অবস্থানরত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, এই হামলার ব্যাপকতা ও স্থায়িত্ব মার্কিন সরকারকে চমকে দিয়েছিল। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পরিবারগুলোকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা করে ঘাঁটির ভবনগুলো খালি করলেও, হামলার এই মাত্রা তাদের ধারণার বাইরে ছিল বলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন। ঘাঁটির বাইরে বসবাসকারী সেনাপরিবারগুলোও ক্ষেপণাস্ত্রের আলো এবং বিস্ফোরণের বিকট শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন।
হামলায় কোনো মার্কিন সেনা নিহত না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে, যা নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো সত্য বলে নিশ্চিত করেছে। একটি ছবিতে প্রথম দিনের হামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার সিস্টেম ধ্বংস হতে দেখা গেছে। পেন্টাগন এখনো এই ক্ষয়ক্ষতিের সুনির্দিষ্ট আর্থিক হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের এই হামলায় বাহরাইন ঘাঁটিটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে বাহরাইনের এই ঘাঁটিটি মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের (Fifth Fleet) সদর দফতর এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর রসদ সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এখানে প্রায় ৮,৩০০ সামরিক ও বেসামরিক কর্মী এবং তাদের পরিবার বসবাস করত।
এই হামলার প্রভাব সমুদ্রে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপরও পড়েছে। বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন খাদ্য সংকটে পড়ার পর মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সরবরাহ রুট বাহরাইন থেকে সরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে স্থানান্তর করতে বাধ্য হয়। পেন্টাগনের পরিদর্শক জেনারেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহরাইন থেকে রসদ পৌঁছাতে যেখানে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগত, সেখানে দিয়েগো গার্সিয়া থেকে সরবরাহ পৌঁছাতে ১৪ থেকে ১৮ দিন সময় লাগছে।
নৌবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা চিফ অব নেভাল অপারেশনস অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল গত মাসে এক সভায় জানান, তারা মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজগুলোর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "আমরা খুব শিগগিরই বাহরাইন ঘাঁটিতে আগের মতো বড় পরিসরে ফিরছি না।"
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১,৪৫০ জন সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারকে বাহরাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে তারা চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। কারণ তাদের একই সাথে বাহরাইন এবং যুক্তরাষ্ট্রে দুই জায়গায় বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে হচ্ছে। এক সেনার স্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের সব সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। এখন সন্তানদের পড়াশোনার তহবিল থেকে টাকা তুলে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।" পেন্টাগন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও সেই অর্থ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।
উদ্বাস্তু হওয়া এই পরিবারগুলোর বেশিরভাগই ভার্জিনিয়ার নরফোক এবং ফ্লোরিডার টাম্পায় আশ্রয় নিয়েছেন। "ব্লু স্টার ফ্যামিলিজ" নামের একটি অলাভজনক সংস্থা টাম্পায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে স্কুল ব্যাগ, জামাকাপড় এবং রান্নার সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছে। তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে কিছু রসদ ভারত মহাসাগরের প্রায় ২,২০০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি দ্বীপ ডিয়েগো গার্সিয়া থেকে সরবরাহ করতে হয়েছিল।
সামরিক বাহিনী এখনও পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় অনুমানে ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত করেনি কারণ কর্মকর্তারা বলছেন যে তারা জানেন না কী পুনর্নির্মাণ করা হবে, তবে নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

