ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বার্ষিক সাধারণ সভায় যোগ দিতে ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামিকে ভিসা দেয়নি অস্ট্রিয়া। স্বাগতিক দেশের এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তেহরান। ইরান একে একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অধিকারের "গুরুতর লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছে।
আইএইএ-তে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা নাজাফি সাধারণ সম্মেলনে উপস্থিত প্রতিনিধিদের বলেন, "আমাদের পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে এই প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান করা আইনি কাঠামোর মূল চেতনা ও নিয়ম উভয়েরই পরিপন্থী।" তিনি অস্ট্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, মোহাম্মদ এসলামিকে ভিসা না দেওয়ার মাধ্যমে ভিয়েনা স্বাগতিক দেশ হিসেবে তার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।
তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং অস্ট্রিয়ার চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করেন। ভিয়েনায় জাতিসংঘের রুশ রাষ্ট্রদূত মিখাইল উলিয়ানোভও ইরানের সুরেই কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেন, অস্ট্রিয়া স্বাগতিক দেশ হিসেবে তার আইনি বাধ্যবাধকতা "গুরুতরভাবে লঙ্ঘন" করেছে।
তবে অস্ট্রিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি কমিটি এসলামির ওপর আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। আইএইএ-তে নিযুক্ত অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান এবনার বলেন, "ফলস্বরূপ, ইরানি প্রতিনিধি দলের একজন সদস্যকে আমাদের ভূখণ্ডে প্রবেশাধিকার দিতে অস্বীকৃতি জানাতে বাধ্য হয়েছে অস্ট্রিয়া।" সাধারণত আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বাগতিক দেশ হিসেবে অস্ট্রিয়া নিষেধাজ্ঞা থাকা কর্মকর্তাদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের কাছে বিশেষ ছাড়ের আবেদন করতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা কমিটি।
এই নিষেধাজ্ঞা কমিটির সিদ্ধান্তের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ভূমিকা ছিল। ভিয়েনায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রিস্টন ওয়েলস গ্রিফিথ জানান, ওয়াশিংটন আপত্তি জানানোর পর অস্ট্রিয়ার ছাড়ের আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। তিনি বলেন, "ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোর কূটনৈতিক সমাধানের দিকে আমাদের মনোযোগ থাকলেও, পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কোনো অর্থবহ সহযোগিতা ছাড়া জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত একজন কর্মকর্তাকে ভ্রমণের অনুমতি আমরা দিতে পারি না।"
এই উত্তেজনার পটভূমিতে রয়েছে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের পারমাণবিক বিরোধ। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালানোর পর থেকে আইএইএ পরিদর্শকদের সেখানে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না তেহরান। তাছাড়া, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মানের (৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ) ৪৪০.৯ কেজি (৯৭২ পাউন্ড) ইউরেনিয়ামের মজুত রয়েছে ইরানের কাছে। আইএইএ-র মতে, এই মজুতকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা কেবল একটি সামান্য প্রযুক্তিগত ধাপের ব্যাপার। সম্প্রতি অঘোষিত স্থানে ইউরেনিয়ামের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার তদন্তে সহযোগিতা না করায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানকে নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানোর প্রস্তাব পাস করেছে আইএইএ।
নিরাপত্তা পরিষদের এই নিষেধাজ্ঞা কমিটি মূলত গত বছর ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং জার্মানির উদ্যোগে সচল হওয়া 'স্ন্যাপব্যাক' ব্যবস্থার অধীনে ইরানের ওপর পুনর্বহাল করা শাস্তিমূলক ব্যবস্থাগুলোর তদারকি করছে। তবে ইরান, রাশিয়া এবং চীন এই স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়ার অধীনে পুনর্বহাল করা নিষেধাজ্ঞার বৈধতা স্বীকার করে না। পশ্চিমা কর্মকর্তারা সন্দেহ করছেন যে, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরানের একটি গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি ছিল এবং অঘোষিত স্থানে পাওয়া ইউরেনিয়ামের অবশিষ্টাংশ তারই প্রমাণ। তবে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না এবং তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

