দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ১ হাজার টনেরও বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করে আলী তাহের রিজের নিচে প্রায় দুই কিলোমিটার (১.২ মাইল) দীর্ঘ দুটি টানেল উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী, এই শক্তিশালী বিস্ফোরণের ফলে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ভূকম্পন সৃষ্টি হয়। তবে এই ঘটনার পর হিজবুল্লাহ বা লেবানন সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
আলী তাহের রিজের প্রায় ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত নাবাতিয়াহ শহরের বাসিন্দা আহমেদ বিবিসিকে জানান, হঠাৎ আকাশ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং এর প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর তারা এক ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পান।
পুরো বাড়িটি এমনভাবে কেঁপে উঠেছিল যেন মনে হচ্ছিল আক্ষরিক অর্থেই ভূমিকম্প হচ্ছে।
ঘটনার পর আতঙ্কিত মানুষের চিৎকার ও শিশুদের কান্নায় চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে এবং বহু মানুষ বৈরুতের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ায় রাস্তাঘাটে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই বিস্ফোরণের কম্পন উত্তর দিকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর সাইদাতেও অনুভূত হয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, এই ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোতে হিজবুল্লাহর 'বদর' ইউনিটের একটি কমান্ড সেন্টার ছিল। সেখানে কয়েক ডজন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী অস্ত্র, মাইন ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক মজুত ছিল।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে আইডিএফ দাবি করেছে, ইরানের অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই কৌশলগত অবকাঠামোটি তৈরি করা হয়েছিল।
অভিযানের সময় ভেতরে থাকা যোদ্ধারা নিহত হয়েছে অথবা পালিয়ে গেছে। এই কমপ্লেক্সটি ধ্বংসের মাধ্যমে ওই এলাকায় আটটি টানেল নির্মূল করার এবং একটি "নিরাপত্তা অঞ্চল" গড়ে তোলার অভিযান সম্পন্ন হলো।
গত সপ্তাহে কয়েক মাসের তীব্র লড়াইয়ের পর আলী তাহের রিজের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। এদিকে, লেবাননের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার নাবাতিয়াহ আল-ফাওকা এবং টায়ার জেলার মনসুরিসহ দক্ষিণের অন্যান্য স্থানেও নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
স্থানীয় টেলিভিশন স্টেশন এমটিভির তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করতে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা নাবাতিয়াহ শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী সেনা মোতায়েন বাড়িয়েছে।
গত ২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবানন এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে বিমান হামলা শুরু করে এবং দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দখল করে নেয়, যা বর্তমানে দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫ শতাংশ।
যদিও লেবানন-ইসরায়েল রূপরেখা অনুযায়ী হিজবুল্লাহর নিরস্ত্র হওয়ার এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে, তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি এই চুক্তিতে অংশ নেয়নি এবং কোনো সরাসরি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত লেবাননে ৩৯৫ জন নারী ও ২৫৯ জন শিশুসহ অন্তত ৪,৩৬২ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, তাদের ৪০ জন সেনা এবং ৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

