কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসন আর্ডের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনায় লন্ডনে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজারিজমের গুরুতর অভিযোগ ওঠার পর সম্প্রতি তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। গত ১৩ আগস্ট দক্ষিণ লন্ডনের একটি ঠিকানায় ৪১ বছর বয়সী এই অধ্যাপকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০২৩ সালে কেমব্রিজের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে তিনি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
লন্ডনের ইনার সাউথ কর্নার্স কোর্টে সংক্ষিপ্ত শুনানির মাধ্যমে এই তদন্ত কার্যক্রমের সূচনা হয়। যুক্তরাজ্যে মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা বা অনিশ্চয়তা থাকলে করনার বা তদন্তকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখার নিয়ম রয়েছে। সিনিয়র করনার ডক্টর জুলিয়ান মরিস শুনানিতে বলেন, "বিভিন্ন প্রতিবেদন আমাকে এটি সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ জুগিয়েছে যে ১২ দিন আগে অধ্যাপক আর্ডের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। তাই এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে হচ্ছে।" তবে পুলিশ জানিয়েছে, মৃত্যুর সময় বিষয়টিকে "অপ্রত্যাশিত" হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এর পেছনে কোনো সন্দেহজনক কারণ পাওয়া যায়নি।
গত মাসে কেমব্রিজের সাবেক দর্শন গবেষক নাথান কফনাস প্রথম আর্ডের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন। কফনাস এর আগে কেমব্রিজের বৈচিত্র্য, ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, যোগ্যতার ভিত্তিতে বিচার করা হলে কৃষ্ণাঙ্গরা ক্রীড়া ও বিনোদন জগৎ ছাড়া অন্য সব উচ্চপদস্থ স্থান থেকে হারিয়ে যাবে। বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে গত সপ্তাহে বেলজিয়ামের ঘেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে কফনাসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
কফনাসের এই অভিযোগের পর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, ২০১৫ সালে জমা দেওয়া আর্ডের পিএইচডি থিসিসের ১০০টিরও বেশি অনুচ্ছেদ অন্য এক গবেষকের পূর্ববর্তী লেখার সাথে হুবহু বা প্রায় হুবহু মিলে গেছে। আর্ডে অবশ্য চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, তবে ডক্টরেট গবেষণার সময় কিছু ভুলের কথা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। এই বিতর্কের জেরে গত ৫ আগস্ট তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেন।
পিএইচডি থিসিস ছাড়াও আর্ডের জীবনের অন্যান্য দাবি নিয়েও সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়। তিনি দাবি করেছিলেন যে, ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন এবং ছয় দিনে ৬০০ মাইল দৌড়ানোর মতো কঠিন শারীরিক কসরত করে দাতব্য তহবিলের জন্য ৫৫ লাখ পাউন্ড (৭৫ লাখ ডলার) সংগ্রহ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি এই দাবি সংশোধন করেন। এছাড়া শৈশবে অটিজমে আক্রান্ত হওয়া, ১১ বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে না পারা এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তে বা লিখতে না পারার দাবি নিয়েও অনেকে সংশয় প্রকাশ করেন।
জেসন আর্ডের এই আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর পরিবারের আর্থিক ও ব্যবহারিক সহায়তা এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খরচ মেটানোর জন্য অনলাইনে একটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে ৭,৯০০ জন দাতার কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ড (৩ লাখ ৫ হাজার ডলার) সংগৃহীত হয়েছে।
এই আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হওয়ার ঠিক এক দিন পরেই যুক্তরাজ্যে সাইমন অ্যান্ড শুস্টার থেকে আর্ডের স্মৃতিকথামূলক বই "গ্রেট অ্যান্ড আনফরচুনেট থিংস" প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। বইটিতে একজন অটিস্টিক ও একসময়ের নিরক্ষর শিশুর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়ে ওঠার জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে বইটি যুক্তরাষ্ট্রেও প্রকাশিত হয়েছিল।

