১৯৯৭ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ ইকুয়েডরের পাহাড়ি বনাঞ্চলে একটি বিরল পাখির আকস্মিক আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। মার্কিন পক্ষীবিদ রবার্ট রিজলি কর্তৃক আবিষ্কৃত সেই 'জোকোটোকো অ্যান্টপিটা' (Jocotoco Antpitta) পাখিটি আজ ইকুয়েডরের পরিবেশ সংরক্ষণের এক অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে। এই আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা 'জোকোটোকো ফাউন্ডেশন' বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ রক্ষার একটি সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে।
সেই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের মুহূর্তটি ছিল রোমাঞ্চকর। পূর্ব আন্দিজের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৫০০ (2500) মিটার উঁচুতে অবস্থিত তাপিচালাকা লজের (Tapichalaca Lodge) কাছে একটি খাড়া ও কর্দমাক্ত পথে দাঁড়িয়ে জোকোটোকো অ্যান্টপিটার ঝোপঝাড় থেকে বের হওয়ার অপেক্ষায় থাকার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। দক্ষিণ ইকুয়েডরের একটি বন্য পথ দিয়ে ভোরের আলোয় হাঁটার সময় রবার্ট রিজলি ও তাঁর দল দূর থেকে একটি অদ্ভুত ডাক শুনতে পান। রিজলি পরে স্মরণ করে বলেন, পাখিটির ডাক ছিল পেঁচার মতো কর্কশ, কিন্তু তারা জানতেন না এটি আসলে কী। রিজলি সেই ডাক রেকর্ড করে পুনরায় বাজানোর পর ঘন বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে একটি মাঝারি আকারের পাখি সরাসরি তাদের সামনে চলে আসে। বাদামি পিঠ, ধূসর বুক, কালো ঝুঁটি এবং সাদা গালবিশিষ্ট এই পাখিটি ছিল বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ অজানা এক নতুন প্রজাতি। স্থানীয় কৃষকরা পাখিটিকে এর কর্কশ ও ঘেউ ঘেউ শব্দের মতো ডাকের কারণে 'জোকোটোকো' নামে ডাকত। আবিষ্কারের দুই বছর পর পাখিটির বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয় 'গ্রালেরিয়া রিজলেই' (Grallaria ridgelyi)।
এই আবিষ্কারের পর ইকুয়েডরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জোকোটোকো ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে সংস্থাটি ইকুয়েডরজুড়ে ১৯টি সংরক্ষিত বনাঞ্চল পরিচালনা করছে, যার আয়তন প্রায় ৫০,০০০ (50000) হেক্টর (১৯৩ বর্গমাইল)। এছাড়া আরও ৮২,০০০ (82000) হেক্টর বেসরকারি ও সামাজিকভাবে মালিকানাধীন জমি পরিচালনা করে তারা। এই অঞ্চলগুলোতে ১,৩৫০টিরও বেশি প্রজাতির পাখি বাস করে, যা ইকুয়েডরের মোট পাখি প্রজাতির ৮০ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট পাখি প্রজাতির প্রায় আট ভাগের এক ভাগ। স্থানীয় মানুষকে পার্ক রেঞ্জার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে সংস্থাটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে。
ফাউন্ডেশনের এই সংরক্ষণ মডেলটি বেশ সহজ ও কার্যকর। তারা বনাঞ্চল উজাড় হওয়া স্থানে দেশীয় গাছপালা রোপণ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনে। শিকারী ও অবৈধ গবাদি পশু চরানো রোধে ক্যামেরা ট্র্যাপ ও অডিও রেকর্ডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় রেঞ্জারদের ব্যবহার করা হচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম ইকুয়েডরের চোকো অঞ্চলের কানান্দে-তে পরিচালিত এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র তিন দশকে বা এক প্রজন্মের ব্যবধানে ধ্বংসপ্রাপ্ত বনাঞ্চল তার ৯০ শতাংশ প্রাণীর ভর (বায়োমাস) এবং প্রজাতি পুনরায় ফিরে পেয়েছে। এছাড়া পুরনো বনের প্রায় ৭৫ শতাংশ আদি প্রজাতি সেখানে ফিরে এসেছে।
জোকোটোকো ফাউন্ডেশন শুধুমাত্র একটি পাখির সুরক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আন্দিজ পর্বতের পশ্চিমাঞ্চলের বুয়েনাভেনচুরা সংরক্ষিত এলাকায় ১৯৮০ সালে আবিষ্কৃত অতি বিরল 'এল ওরো প্যারাকিট' (El Oro parakeet) পাখির সুরক্ষায় কাজ করছে তারা, যার সংখ্যা বর্তমানে ১,০০০-এরও কম। সেখানে প্রায় ২০ (20) টি পান্না-সবুজ রঙের পাখির ঝাঁক দেখা যায়, যার পুরুষ পাখিদের কপালে একটি স্বতন্ত্র লাল রঙ রয়েছে। সম্প্রতি ইকুয়েডর সফরের সময় ফাউন্ডেশনের ১০ (10) টি সংরক্ষিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কুইটোর উত্তর-পশ্চিমে চোকো অঞ্চল এবং আমাজন পাদদেশের কোপালিঙ্গা বনাঞ্চল, পাশাপাশি গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের সান ক্রিস্টোবাল দ্বীপের 'লস পেট্রেলস' সংরক্ষিত এলাকা যা বিপন্ন সামুদ্রিক পাখি 'গ্যালাপাগোস পেট্রেল'-এর একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত চাকানা সংরক্ষিত এলাকায় উচ্চ-অক্ষাংশের হামিংবার্ড 'ইকুয়েডরিয়ান হিলস্টার' এবং বিষপ্রয়োগের কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা বিশ্বের বৃহত্তম উড়ন্ত পাখি 'আন্দিয়ান কনডর' রক্ষা পাচ্ছে।
আমেরিকান বার্ড কনজারভেন্সির প্রেসিডেন্ট মাইক পার এই কাজের প্রশংসা করে বলেন, ইকুয়েডরের বিরল ও পরিযায়ী পাখি রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশ পর্যটন, জনসচেতনতা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার এই সমন্বয় বিশ্বমানের। বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক পরিচালক ইয়ান জে. ডেভিডসন এটিকে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সংরক্ষণের একটি সফল গল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। জোকোটোকো ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ড. মার্টিন শেফার আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, "আমরা যা হারিয়েছি তা পুনরুদ্ধার করার ক্ষমতা আমাদের নিজেদের হাতেই রয়েছে।" মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পের তহবিল প্রত্যাহার করে নেওয়ার এই কঠিন সময়ে বিজ্ঞানী ও স্থানীয় মানুষের যৌথ প্রচেষ্টার এই মডেলটি পরিবেশ রক্ষার এক অনন্য উদাহরণ।

