কসোভোর ১৯৯৮-৯৯ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের প্রায় তিন দশক পর, নিখোঁজ প্রিয়জনদের সন্ধানে নতুন আশা ও বেদনার দোলাচলে দুলছেন স্বজনরা। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় জুবিন পোটোক (Zubin Potok) পৌরসভার কালুডার ই ভোগেল (Kalluder e Vogel) গ্রামে সম্প্রতি আবিষ্কৃত গণকবরগুলোতে খননকাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
এই খননকাজের দিকে দূর থেকে অধীর আগ্রহে চেয়ে আছেন এরবলিন আদেমী (Erblin Ademi)। প্রায় ৩০ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া তাঁর বাবার অবশিষ্টাংশ এখানে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তাঁর মনে একই সাথে ভয় ও আশা কাজ করছে। ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে, কসোভোর একজন বিশিষ্ট সার্জন আদেম আদেমী (Adem Ademi) সহ ২২ জন বুদ্ধিজীবী নিখোঁজ হন। তখন এরবলিনের বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর।
কসোভোর যুদ্ধে প্রায় ১৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। হিউম্যানিটারিয়ান ল সেন্টার (Humanitarian Law Center) নামের একটি মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, যুদ্ধকালীন নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ১,২০০ জন জাতিগত আলবেনীয়, প্রায় ৪০০ জন জাতিগত সার্ব এবং কয়েক ডজন রোমা সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ১,৬০০ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের দেহাবশেষ বিভিন্ন অচিহ্নিত গণকবরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
জুলাই মাসের শেষের দিকে কালুডার ই ভোগেল গ্রামে মানুষের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার পর সেখানে খনন শুরু হয়। কসোভোর প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তি (Albin Kurti) জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া অবশিষ্টাংশগুলো সেই নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের হতে পারে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। সার্বীয় সেনাদের হাত থেকে বাঁচতে কসোভো থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় তারা ধরা পড়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
খননকাজ শুরু হওয়া নিয়ে এরবলিন আদেমী বলেন, "যখনই আমরা খননকাজ শুরুর কথা শুনি, তখনই আমাদের মনে আশা ও বেদনার এক মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়। যত বছরই কেটে যাক না কেন, ব্যথার অনুভূতি সবসময়ই থাকবে… তবে একই সাথে সত্য উদঘাটিত হওয়ার একটি আশাও কাজ করে।"
কসোভো ২০০৮ সালে সার্বিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও বেলগ্রেড তা এখনো স্বীকার করেনি। ২০২৩ সালের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে সহযোগিতা করার চুক্তি হলেও, একে অপরের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলছে। হিউম্যানিটারিয়ান ল সেন্টারের বেকিম ব্লাকাজ (Bekim Blakaj) বলেন, "এটি স্পষ্ট যে কর্তৃপক্ষগুলো সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক নয়।"
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার জন্য কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত দিয়েছে ইইউ। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের জাতিসংঘ ট্রাইব্যুনালে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সার্বীয় রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও সাজা হয়েছে।
বাবার একটি পুরোনো ছবি হাতে নিয়ে এরবলিন আদেমী বলেন, "প্রতিটি মানুষেরই একটি কবর পাওয়ার অধিকার আছে, যেখানে স্বজনরা তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে পারেন, স্মরণ করতে পারেন। আমরা আশাবাদী যে এবার হয়তো এই অপেক্ষার অবসান ঘটবে। প্রক্রিয়াটি যত দীর্ঘই হোক না কেন, আমরা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করব যাতে তাঁদের যোগ্য সম্মান দেওয়া যায়।"

