২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে মুখ খুলেছেন দুই বিমান ছিনতাইকারীর সাবেক বাড়িওয়ালি হলি র্যাচফোর্ড। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর যে আবাসিক কমপ্লেক্সের দায়িত্বে তিনি ছিলেন, সেখানে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকা দুই ব্যক্তি যে আধুনিক মার্কিন ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের রূপকার হবেন, তা আজও বিশ্বাস করতে পারেন না তিনি। বিবিসি-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে র্যাচফোর্ড তাঁর সেই অভিজ্ঞতা এবং সন্দেহভাজন সৌদি গোয়েন্দা ওমর আল-বায়ুমির সঙ্গে হামলাকারীদের ঘনিষ্ঠতার নানা অজানা তথ্য তুলে ধরেছেন।
১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর পার্কউড অ্যাপার্টমেন্টসের ১৫২ নম্বর ইউনিটে সপরিবারে থাকতে আসেন ওমর আল-বায়ুমি। চল্লিশোর্ধ্ব এই সৌদি নাগরিক নিজেকে একজন বয়স্ক শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। অ্যাপার্টমেন্টের ম্যানেজার ও বাসিন্দা হলি র্যাচফোর্ডের আয়োজিত বিভিন্ন পুল পার্টিতে নিয়মিত অংশ নিতেন বায়ুমি। র্যাচফোর্ড স্মৃতিচারণ করে বলেন, তিনি সব সময়ই হাসিখুশি ও অত্যন্ত বন্ধুবৎসল ছিলেন। কিন্তু এর কয়েক মাস পরেই বায়ুমি এমন দুই ব্যক্তির সঙ্গে র্যাচফোর্ডের পরিচয় করিয়ে দেন, যারা পরবর্তীতে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ৭৭ নম্বর ফ্লাইটটি ছিনতাই করে পেন্টাগনে আছড়ে ফেলেছিল। এই দুই হামলাকারী হলেন নওয়াফ আল-হাজমি এবং খালিদ আল-মিহধার।
বর্তমানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ৯/১১ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দায়ের করা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের এক বিশাল মামলায় মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন এই ওমর আল-বায়ুমি। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো প্রথম দুই ছিনতাইকারী হাজমি ও মিহধারকে সান ডিয়েগোতে থাকা-খাওয়াসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে হামলার ছক বাস্তবায়নে সাহায্য করেছিলেন তিনি। নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত গত বছর রায় দিয়েছে যে, বায়ুমি এবং যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত এক সৌদি কূটনীতিক ছিনতাইকারীদের সহায়তা করার সময় মূলত সৌদি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রাখছিলেন—এমন ধারণার যথেষ্ট যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। তবে সৌদি আরব এবং বায়ুমি বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
বিবিসি রেডিও ফোর-এর পডকাস্ট 'ইনট্রিগ: এ ৯/১১ স্টোরি' এবং প্যানোরামার বিশেষ তথ্যচিত্রে র্যাচফোর্ডের এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেখানে তিনি বায়ুমির সেই দাবিকে সরাসরি মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, যা তিনি পুলিশ, এফবিআই এবং নিউ ইয়র্কের আদালতে দিয়েছিলেন। বায়ুমি দাবি করেছিলেন যে, লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি রেস্তোরাঁয় আকস্মিকভাবে এই দুই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর দেখা হয় এবং তাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু র্যাচফোর্ড বলেন, এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ছিনতাইকারীদের তাঁর অফিসে নিয়ে আসার আগেই বায়ুমি বেশ কয়েকবার সস্তা এবং নিজের ফ্ল্যাটের কাছাকাছি কোনো অ্যাপার্টমেন্ট খালি আছে কি না, তা নিয়ে খোঁজখবর করেছিলেন।
২০০০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বায়ুমি ওই দুই তরুণকে র্যাচফোর্ডের অফিসে নিয়ে আসেন। তারা ইংরেজি বলতে পারতেন না এবং তাদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা আয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছিল না। নিয়ম অনুযায়ী র্যাচফোর্ড প্রথমে তাদের ঘর ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরদিনই বায়ুমি তাদের নিয়ে ব্যাংকে যান এবং একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে সাহায্য করেন। এরপরের দিন বায়ুমি নিজেই তাদের ভাড়ার চুক্তিনামায় আইনি জামিনদার বা গ্যারান্টর হিসেবে স্বাক্ষর করেন। এভাবেই তারা বায়ুমির ফ্ল্যাটের ঠিক পাশেই ১৫০ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতে শুরু করেন।
র্যাচফোর্ড জানান, পরবর্তী মাসগুলোতে তিনি প্রায়ই ওই তিনজনকে একসঙ্গে দেখতেন। এমনকি তাঁর অফিসে এসে তারা একসঙ্গে চা-বিস্কুটও খেয়েছেন। শুধু তাই নয়, ছিনতাইকারীরা সময়মতো ভাড়া দিতে না পারলে বায়ুমি নিজেই সেই টাকা পরিশোধ করে দিতেন বলে তিনি এফবিআই-কে জানিয়েছেন। অথচ তদন্তকারীদের কাছে বায়ুমি দাবি করেছিলেন যে, ঘর ভাড়া নেওয়ার পর তিনি তাদের এড়িয়ে চলতেন এবং তাদের নামও মনে করতে পারছিলেন না।
৯/১১ হামলার পর এফবিআই তদন্তে জানতে পারে, সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে বায়ুমিকে বছরে প্রায় ৯০ হাজার ডলার দেওয়া হতো, যদিও তিনি কোনো কাজ করতেন না। ছিনতাইকারীরা সান ডিয়েগোতে আসার পর তাঁর বেতন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। এছাড়াও ব্রিটিশ পুলিশের তল্লাশিতে বায়ুমির বাড়ি থেকে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত একটি সৌদি দাতব্য সংস্থার চিঠি এবং জিহাদি মনোভাবাপন্ন কিছু লেখা উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম থেকে বায়ুমিকে গ্রেপ্তার করা হলেও সাত দিন পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবে চলে যান। ২০০৪ সালে মার্কিন ৯/১১ কমিশন তাঁকে একপ্রকার নির্দোষ ঘোষণা করে, যদিও এফবিআই তখন তাদের কাছে সব প্রমাণ হস্তান্তর করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনার পর হলি র্যাচফোর্ডের জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। তিনি মানুষের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং নিজেকে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চলের এক জনমানবহীন মরুভূমি এলাকায় অত্যন্ত নির্জন জীবনযাপন করছেন। র্যাচফোর্ড আক্ষেপ করে বলেন, "আমি নিজেকে খুব বোকা মনে করি। আমি এমন কিছু মানুষকে বিশ্বাস করেছিলাম এবং তাদের যত্ন নিয়েছিলাম, যারা পরে এত বড় অপরাধ করেছে। ২৫ বছর ধরে এই অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে যে, আমি যদি সেদিন আরও কঠোর হতাম, তবে হয়তো এই ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো যেত।"

