জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাজ্যের সমুদ্রগুলোতে ঘন ঘন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বা 'মেরিন হিটওয়েভ' আঘাত হানছে। এর ফলে দেশটির সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ঠান্ডা পানির আদি বাসিন্দা মাছগুলো উত্তর দিকে চলে যাচ্ছে এবং তাদের জায়গায় উষ্ণ পানির নতুন নতুন প্রজাতির আগমন ঘটছে। বিজ্ঞানীরা একে যুক্তরাজ্যের সমুদ্রের জন্য 'নতুন স্বাভাবিকতা' বা নিউ নরমাল বলে অভিহিত করছেন।
ব্রাইটনভিত্তিক চার্টার বোট 'ইয়েলোফিন'-এর স্কিপার কার্ট ল্যান্ডার সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেলের শিপিং লেনে এক জোড়া সানফিশ দেখতে পান। বিশাল আকৃতির এই মাছগুলো পাশ ফিরে পাখনা নাড়াচ্ছিল, যা সাধারণত পাখিদের আকৃষ্ট করে পরজীবী খাইয়ে নেওয়ার একটি প্রাকৃতিক কৌশল। ল্যান্ডার জানান, মেরিন হিটওয়েভের কারণে এ বছর ব্রিটিশ উপকূলে সানফিশের উপস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাধারণত স্থলভাগে দীর্ঘস্থায়ী গরমের পর সমুদ্রের পানিও উষ্ণ হয়ে ওঠে, যা মেরিন হিটওয়েভের সৃষ্টি করে। মেট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২৫ বছরটি ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী, যখন ব্রিটিশ সমুদ্রের কিছু অংশে বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়ই তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি ছিল। ২০২৬ সালেও এর ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। সাউথহ্যাম্পটনের ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফি সেন্টারের সিনিয়র গবেষক ড. জো জ্যাকবস একে "আমাদের নতুন স্বাভাবিকতা" বলে বর্ণনা করেছেন।
পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাছের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। ল্যান্ডার জানান, আগে তিনি গ্রীষ্মকালে বছরে অন্তত কয়েক শ কড মাছ ধরতেন, কিন্তু এখন বছরে মাত্র একটি বা দুটি কড পাওয়া যায়। ড. জো জ্যাকবস বলেন, ঠান্ডা পানির এই প্রজাতিগুলো এখন আর দক্ষিণ উপকূলে দেখা যাচ্ছে না। তারা উত্তর দিকে স্কটল্যান্ডের শীতল পানির দিকে চলে গেছে। তবে এই স্থানান্তর সাময়িক নাকি স্থায়ী, তা এখনো নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে, এখন বাস, কম্বার এবং ট্রিগারফিশের মতো উষ্ণ পানির মাছ বেশি ধরা পড়ছে। গত বছরের 'স্টেট অব দ্য সাউথ-ওয়েস্ট সিজ' রিপোর্ট অনুযায়ী, সার্ডিন এবং অ্যানচোভির মতো উষ্ণ পানির মাছের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কর্নিশ বন্দর ফালমাউথের ডাইভার জিও রিয়েল জানান, পানির সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তনও সামুদ্রিক জীবনের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তিনি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তার প্রিয় 'স্মল স্পটেড ক্যাটশার্ক' (বা লেসার-স্পটেড ডগফিশ) দেখতে পাননি। এই ছোট হাঙ্গরগুলো সাধারণত ১৬-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পছন্দ করে। কিন্তু এ বছর গ্রীষ্মে পানির তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে তারা ভূমধ্যসাগরের হাঙ্গরগুলোর মতো গভীর ও শীতল পানিতে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ডেভন এবং কর্নওয়ালের উষ্ণ পানিতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে সাধারণ অক্টোপাস প্রচুর সংখ্যায় এসেছে। এটি কাঁকড়া ও লবস্টার শিকারিদের জন্য সমস্যা তৈরি করছে, কারণ অক্টোপাসগুলো ফাঁদে আটকে থাকা কাঁকড়া সহজে খেয়ে ফেলছে। অবশ্য এই অক্টোপাসগুলোর কারণে রিসোস ডলফিনের মতো শিকারি প্রাণীদের আনাগোনা বেড়েছে। ২০২৬ সালে অক্টোপাস শিকারের পরিমাণও অনেক বেড়েছে।
উষ্ণ পানির কারণে জেলিফিশের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে ভূমধ্যসাগর থেকে 'মভ স্টিঙ্গার'-এর মতো ক্ষতিকর জেলিফিশের আগমন ঘটলে তা উদ্বেগের কারণ হবে বলে জানান জ্যাকবস। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যের সৈকতে অত্যন্ত বিরল 'স্মলটুথ স্যান্ড টাইগার শার্ক' ভেসে এসেছে এবং ২০২৫ সালে ক্যারিবীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের 'হেয়ার কার্লার সি স্লাগ' প্রথম রেকর্ড করা হয়েছে। পাশাপাশি, 'ডিডেমনাম সিউডোভেক্সিলাম' নামক একটি নতুন সি স্কুইর্ট বিজ্ঞানীদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সামুদ্রিক তলদেশ ঢেকে ফেলে ক্ষতি করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে তীব্র মেরিন হিটওয়েভের কারণে সমুদ্রের তলদেশের ঘাস (সিগ্রাস) ও কেল্প (এক ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল) ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যেও ১৯৩০-এর দশক থেকে প্রায় ৯২% সিগ্রাস মেদোস বিলুপ্ত হয়েছে এবং সাসেক্সে কেল্পের ক্ষয়ক্ষতি ৯৬% ছাড়িয়ে যেতে পারে। 'হেস্টিংস কেল্প প্রজেক্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস উইলিয়ামস জানান, স্থলভাগের বনের মতো সমুদ্রের নিচের এই ধ্বংসযজ্ঞ বাইরে থেকে দেখা যায় না। কেল্প সাধারণত ৮-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা পছন্দ করে। উইলিয়ামসের ল্যাবরেটরির চিলারগুলোও এখন তাপমাত্রা ১২ ডিগ্রির নিচে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। 'সিগ্রাস ওশান রেসকিউ' প্রজেক্ট ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ১৫% সিগ্রাস মেদোস পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
উষ্ণ পানি ক্ষতিকারক অ্যালগাল ব্লুমের জন্ম দিতে পারে, যা মানুষ ও প্রাণীদের অসুস্থ করতে পারে। বিস্কে উপসাগরে সাঁতারুদের সুরক্ষায় সৈকত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তবে যুক্তরাজ্যের অবকাঠামো এখনো এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত নয় বলে জানান জ্যাকবস। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই তাপপ্রবাহের কারণে কড ও ম্যাকেরেল মৎস্য শিল্প চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফসিল ফুয়েল পোড়ানোর ফলে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে চরম আবহাওয়া আরও চরম রূপ নিচ্ছে।

