স্মার্টফোনের যুগে সন্তানদের সুরক্ষায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে এক ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস। বুধবার (২৫ আগস্ট) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের জোটের সঙ্গে এই সমঝোতা চুক্তি সই করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করা এবং জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগের নিষ্পত্তিতে মেটা ১৬.৬৮ বিলিয়ন (১ হাজার ৬৬৮ কোটি) ডলার পর্যন্ত পরিশোধ করতে এবং তাদের অ্যাপগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সম্মত হয়েছে।
এই সমঝোতাকে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাউথ ক্যারোলাইনার স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ ব্র্যান্ডন গাফি। তাঁর ১৭ বছর বয়সী ছেলে গ্যাভিন ইনস্টাগ্রামে অনলাইন সেক্সটর্শনের (যৌন ব্ল্যাকমেইল) শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছিল। ইনস্টাগ্রামের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনাকারী গাফি বলেন, "এটি একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। এটি আমার লড়াই এবং সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে পুরোপুরি স্বীকৃতি দেয়।"
সমঝোতা প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের অ্যাকাউন্টের জন্য মেটাকে বেশ কিছু স্বয়ংক্রিয় পরিবর্তন আনতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাকাউন্টগুলো ডিফল্টভাবে ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) করা, যাতে কেবল অনুমোদিত ফলোয়াররাই তাদের পোস্ট দেখতে এবং বার্তা পাঠাতে পারে। এছাড়া প্রতিদিন ৬০ মিনিট ব্যবহারের পর অ্যাপ বন্ধ করার তাগিদ দেওয়া, রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত নোটিফিকেশন বন্ধ রেখে 'স্লিপ মোড' চালু করা এবং স্বয়ংক্রিয় উত্তর পাঠানো, এবং আত্মক্ষতি, খাদ্যাভ্যাসের ব্যাধি বা সহিংসতার মতো সংবেদনশীল কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক করার নিয়ম রাখা হয়েছে। তবে তদারকি করতে পারা অভিভাবকরা চাইলে এই সেটিংসগুলো পরিবর্তন করতে পারবেন।
মেটা জানিয়েছে, নতুন এই স্বয়ংক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালু করা হবে। আর বয়স নিশ্চিতকরণের প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। মেটার প্রধান আইন কর্মকর্তা সি.জে. মাহোনি এক বিবৃতিতে বলেন, "আমাদের তৈরি করা এই কাঠামো অভিভাবকদের সহজেই সন্তানদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে।" একই সঙ্গে তিনি টিকটক এবং ইউটিউবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোকেও এই কাঠামো অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, "যেহেতু কিশোর-কিশোরীরা অবলীলায় ডজন ডজন অ্যাপ ব্যবহার করে, তাই আমাদের পুরো শিল্পজুড়ে একটি সমাধান প্রয়োজন।" তবে টিকটক বা ইউটিউব এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। উল্লেখ্য, তরুণ ব্যবহারকারীদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর অভিযোগে মেটা, স্ন্যাপচ্যাট, টিকটক ও ইউটিউব এখনো হাজার হাজার মামলার মুখোমুখি রয়েছে।
কর্নেল টেক এবং কর্নেল ল স্কুলের ডিজিটাল ও ইনফরমেশন আইনের অধ্যাপক জেমস গ্রিমেলম্যান বলেন, এই সমঝোতা একটি নজির স্থাপন করেছে যে অঙ্গরাজ্যগুলো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য করতে পারে। তিনি আরও বলেন, "অভিভাবকদের জানা উচিত যে তাদের সন্তানরা কীভাবে ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করবে, সে বিষয়ে নতুন কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আসছে।" গ্রিমেলম্যানের মতে, মেটা এবং অ্যাটর্নি জেনারেলরা এটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন, যা সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মেটার পণ্যের এই দুর্বলতা অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে "আরও বেশি উদ্বিগ্ন" হওয়ার আরেকটি কারণ তৈরি করল।
করোনা-পরবর্তী বিশ্বে তরুণদের স্ক্রিন টাইম এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বিশ্বজুড়ে জোরদার হয়েছে। জোনাথন হাইটের লেখা বই "দ্য অ্যানশাস জেনারেশন", স্কুলে ফোন নিষিদ্ধকরণ এবং মার্কিন সার্জন জেনারেলের নিঃসঙ্গতা ও স্ক্রিন সংক্রান্ত সতর্কবার্তা এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। 'ল্যান্ডলাইন কিডস', 'আউটসাইড প্লে ল্যাব', 'লগ অফ মুভমেন্ট' এবং 'ওকে টু ডিলে'-এর মতো অভিভাবক দলগুলো এখন প্রযুক্তিহীন বা কম প্রযুক্তির জীবনযাপনের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। কেউ কেউ ১৯৯৫ সালের মতো প্রযুক্তিহীন বা কম প্রযুক্তির জীবনযাপনে ফিরে যাচ্ছেন, লক করা পাউচ বা আসক্তি কমানোর অ্যাপ ব্যবহার করছেন এবং সন্তানদের সাথে কথা বলার জন্য সাম্প্রতিক 'টয় স্টোরি ৫' সিনেমাটিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
এমনকি জেন-জি প্রজন্মের তরুণেরাও ফোন-মুক্ত পার্টি এবং অ্যানালগ ব্যাগের ব্যবহার শুরু করেছে। গত জুনে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ইভেন্টব্রাইট (Eventbrite) একে 'দ্য অফলাইন সামার' হিসেবে ঘোষণা করে। বিশ্বজুড়ে এই পরিবর্তনের হাওয়া ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫টি অঙ্গরাজ্য স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করেছে। গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়ে। এরপর ব্রাজিল, কানাডা, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক এবং ইন্দোনেশিয়াও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ বা অনুমোদন করেছে।
কিশোর-কিশোরীদের প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি থেকে দূরে রাখার এই আন্দোলনটি এতদিন ধীরগতিতে চললেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন মেটার এই বিশাল সমঝোতা একে মূলধারার একটি বড় আন্দোলনে রূপ দিতে পারে। অলাভজনক সংস্থা 'ব্যালেন্স প্রজেক্ট'-এর প্রতিষ্ঠাতা হলি মস্কোটিয়েলো বলেন, "যত বেশি সচেতনতা তৈরি হবে, অভিভাবকরা তত বেশি মানিয়ে নিতে পারবেন।" তিনি মনে করেন এই সমঝোতা একটি জোরালো নজির স্থাপন করবে যা মানুষকে আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করবে। তিনি আরও যোগ করেন, "আমি আনন্দিত কারণ এই মুহূর্তটি পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি আত্মোপলব্ধির সুযোগ এনে দিয়েছে। তারা এখন বলতে পারবে যে, আমরা হয়তো আগে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কিন্তু এখন আমরা আরও ভালো জানি এবং আরও ভালো কিছু করতে পারি।"

