লর্ডসে ইংল্যান্ডের কাছে ১৯৪ রানের বড় ব্যবধানে হেরে সিরিজ খোয়ানোর পর পাকিস্তান ক্রিকেট দলে বড়সড় রদবদল আনা হয়েছে। প্রধান কোচ ও বোলিং কোচসহ স্কোয়াডের অর্ধেক খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) চেয়ারম্যান মহসিন নকভি। তাঁর দাবি, শোচনীয় পরাজয়ের পর দলে পরিবর্তন আনা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। একই সঙ্গে পাকিস্তান ক্রিকেট ধ্বংসের মুখে পড়েছে বলে যে সমালোচনা করা হচ্ছে, তাকে 'অন্যায়' বলে অভিহিত করেছেন তিনি এবং খেলোয়াড়দের মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
এজবাস্টনে সিরিজের শেষ টেস্টের আগে পাকিস্তানের সাতজন খেলোয়াড়কে পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ এবং bowling কোচ উমর গুলকে তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পিসিবির এমন নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। এমনকি পাকিস্তানের সাবেক তারকা ক্রিকেটার শাহিদ আফ্রিদি এবং শোয়েব মালিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
তবে এসব সমালোচনাকে পাত্তা দিচ্ছেন না পিসিবি প্রধান। জিও নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নকভি বলেন, "দল নির্বাচন নিয়ে সবসময়ই সমালোচনা হয় এবং আমি এটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নই। আমরা ফলাফলের জন্য দায়বদ্ধ এবং গত দুই ম্যাচে যা ঘটেছে তা মোটেও সঠিক ছিল না। তবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের মতো টেস্টেও আমরা উন্নতির পথ খুঁজছি।"
পাকিস্তানের ক্রিকেটের সাম্প্রতিক বিপর্যয়কে অনেকেই দেশটির হকির পতনের সঙ্গে তুলনা করছেন। গত শতাব্দীতে হকি বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করা পাকিস্তান চারটি বিশ্বকাপ ও তিনটি অলিম্পিক সোনা জিতেছিল। কিন্তু চলতি শতাব্দীতে এসে তাদের হকি খাদের কিনারে গিয়ে ঠেকেছে। সম্প্রতি দীর্ঘ আট বছর পর ১৬ দলের বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১১তম অবস্থানে শেষ করেছে তারা। ক্রিকেটেও চিত্রটা খুব একটা ভিন্ন নয়। শেষ ২০টি টেস্টের মধ্যে ১৫টিতেই হেরেছে পাকিস্তান। বর্তমানে তারা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ (ডব্লিউটিসি) তালিকার তলানিতে রয়েছে, আগের চক্রেও তারা শেষ স্থানেই ছিল। এছাড়া শেষ তিনটি আইসিসি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি। গত বছর ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কোনো জয় ছাড়াই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় তারা। আর চলতি বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ডালাসে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই লজ্জাজনক বিদায় নিতে হয়েছিল বাবর আজমদের।
সমালোচকদের জবাবে নকভি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণ টেনে প্রশ্ন তোলেন, "নামিবিয়া ও আয়ারল্যান্ডের কাছে হারার পর কি দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারতের ক্রিকেট ধ্বংস হয়ে গেছে?" উল্লেখ্য, বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা ডব্লিউটিসি চ্যাম্পিয়ন এবং ভারত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপাধারী। নকভি আরও যোগ করেন, "আমাদের জন্য সিরিজের প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো খেলোয়াড় পারফর্ম না করলে তাকে পরিবর্তন করা ছাড়া আমাদের হাতে কোনো বিকল্প থাকে না। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য কাউকে দল থেকে চিরতরে বাদ দেওয়া নয়, কেবল তার জায়গায় অন্য কাউকে সুযোগ দেওয়া। যেমন সালমান আগা একজন চমৎকার খেলোয়াড়, কিন্তু কোনো কারণে সে পারফর্ম করতে পারেনি। তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথাও বলা হয়েছে।"
সাবেক ক্রিকেটারদের নেতিবাচক প্রচারণার সমালোচনা করে পিসিবি প্রধান বলেন, "পারফরম্যান্স নিয়ে সবারই সমালোচনা করার অধিকার আছে, কিন্তু তারা এই হারগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন ক্রিকেট শেষ হয়ে গেছে। যেসব সাবেক খেলোয়াড় জীবনে কিছুই অর্জন করতে পারেননি, তাদের মুখ থেকে এমন প্রচারণা মেনে নেওয়া যায় না। আমি মাঝে মাঝে সাবেক ক্রিকেটারদের পরামর্শ নিই। টেস্টে আমাদের পারফরম্যান্স খারাপ হচ্ছে এবং এর পেছনের কারণগুলো খুঁজে বের করতে আমরা আলোচনা করেছি। এর পেছনে মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে, যা আমরা খতিয়ে দেখব। আমি কাউকে উদ্দেশ্যহীনভাবে খেলোয়াড়দের দোষারোপ করতে দেব না। খেলোয়াড়দের মনোবল ভেঙে দেওয়া বন্ধ করুন, এটি অন্যায়।" নকভি আরও দাবি করেন, মূলত তিনি বোর্ডের দায়িত্বে থাকার কারণেই এই সমালোচনাগুলো করা হচ্ছে।
নকভি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ও পরের র্যাঙ্কিংয়ের চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২৪ সালের শুরুতে নকভি পিসিবি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার এক মাস আগে পাকিস্তান ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি উভয় ফরম্যাটেই চতুর্থ স্থানে ছিল। ২০২৫ সালের ১৩ মে যখন অ্যান্ডি হেসনকে সাদা বলের দলের প্রধান কোচ ঘোষণা করা হয়, তখন পাকিস্তান ওয়ানডেতে পঞ্চম এবং টি-টোয়েন্টিতে অষ্টম স্থানে ছিল। বর্তমানে তারা ওয়ানডেতে পঞ্চম ও টি-টোয়েন্টিতে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ২০২৪ সালের শুরুতে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে থাকা পাকিস্তান এখন নেমে গেছে অষ্টম স্থানে।
পাকিস্তান দলে ডাক পাওয়া নতুন সাতজন খেলোয়াড়ের মধ্যে পাঁচজনই এখনও আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি। পিসিবি আশা করছে, এই তরুণরা ভালো পারফর্ম করে বর্তমান টেস্ট চক্রের শেষ দুটি হোম সিরিজ (শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে) খেলার জন্য একটি শক্ত কম্বিনেশন তৈরিতে সাহায্য করবে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর থেকে এজবাস্টনে শুরু হবে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট।

