প্যাটাগোনিয়ার গহীন বনাঞ্চলে বসবাসকারী এক বিশালাকার সোনালি-হলুদ রঙের মৌমাছি, যা ‘উড়ন্ত ইঁদুর’ বা ‘মস্কার্দন’ (moscardón) নামে পরিচিত, ২০২৬ সালের সেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণীর (invertebrate of the year) খেতাব পাওয়ার দৌড়ে শামিল হয়েছে। বৈজ্ঞানিক নাম ‘বোম্বাস ডালবোমি’ (Bombus dahlbomii) হলেও কীটপতঙ্গ গবেষকদের কাছে এটি পরিচিত ‘কীটপতঙ্গ জগতের পান্ডা’ হিসেবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে চিলি ও আর্জেন্টিনার এই আদি বাসিন্দা এখন চরম বিলুপ্তির মুখে রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫০ প্রজাতির বাম্বলবি বা বড় মৌমাছির মধ্যে বোম্বাস ডালবোমি সবচেয়ে বড়। এই প্রজাতির লোমশ স্ত্রী মৌমাছিগুলো লম্বায় প্রায় ৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে এবং এদের ওজন হয় প্রায় ১.৫ গ্রাম। আর্জেন্টিনার প্যাটাগোনিয়া অঞ্চলের নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এদের বুক ও পেটজুড়ে থাকা দীর্ঘ লোমের কারণে এদের দেখতে অত্যন্ত তুলতুলে লাগে। সাধারণত মৌমাছিরা লাল রঙ দেখতে পায় না বলে লাল ফুল এড়িয়ে চলে। কিন্তু মস্কার্দন মৌমাছির চোখে রয়েছে বিশেষ এক ধরনের রিসেপ্টর ব্যবস্থা, যার সাহায্যে এরা লাল রঙ শনাক্ত করতে পারে। ফলে প্যাটাগোনিয়ার স্থানীয় লাল ফুল ‘চিলিয়ান বেলফ্লাওয়ার’ (Lapageria rosea) এবং ‘পেরুভিয়ান লিলি’র (Alstroemeria aurea) পরাগায়নে এরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্যাটাগোনিয়ার এই অনন্য মৌমাছিটি বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। তবে এর পেছনে কেবল বন উজাড় বা বাসস্থান ধ্বংসই দায়ী নয়, বরং মানুষের অন্যান্য অবিবেচকমূলক সিদ্ধান্তও ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮০-এর দশক থেকে চিলিতে বাণিজ্যিক কৃষিকাজে পরাগায়নের সহায়তার জন্য ইউরোপ থেকে দুটি বিদেশি মৌমাছির প্রজাতি আমদানি করা হয়েছিল—‘রুডারাল বাম্বলবি’ (Bombus ruderatus) এবং ‘বাফ-টেইলড বাম্বলবি’ (Bombus terrestris)। এই বিদেশি প্রজাতিগুলো দ্রুত চিলি ও আর্জেন্টিনায় ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় বোম্বাস ডালবোমির সঙ্গে খাদ্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। শুধু তা-ই নয়, ইউরোপীয় এই মৌমাছিগুলো এমন কিছু নতুন রোগ ও জীবাণু বহন করে এনেছে, যা স্থানীয় মস্কার্দন মৌমাছির জনসংখ্যাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
মস্কার্দনের এই বিলুপ্তি প্যাটাগোনিয়ার পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এদের ওপর নির্ভরশীল কিছু বিশেষ প্রজাতির পরজীবী মাইটও এখন হুমকির মুখে। অন্যদিকে, বিদেশি মৌমাছিগুলো ইউরোপীয় ক্ষতিকর আগাছা ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এই ক্ষতিকর বিদেশি মৌমাছিগুলোকে এখন আর পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
স্লোভেনিয়ার লুব্লিয়ানার গবেষক অ্যান্টন গ্রাদিশেক এই মৌমাছিটিকে বর্ষসেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণীর তালিকায় মনোনীত করেছেন। তিনি একটি অ্যাকাডেমিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে বায়োঅ্যাকোস্টিকস বা শব্দ রেকর্ডিং বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিপন্ন মৌমাছি নিয়ে গবেষণা করছেন। গ্রাদিশেক জানান, মাঠে কাজ করার সময় তারা মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি মস্কার্দন মৌমাছির দেখা পেয়েছিলেন। তার মতে, বাম্বলবি বা এই মৌমাছিগুলো হলো কীটপতঙ্গ জগতের পান্ডা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের এক অনন্য প্রতীক।

