পুয়ের্তো রিকোর দুই ডজনেরও বেশি শহর ও নগরীতে তীব্র পানি সংকটের মুখে খরা পরিস্থিতিকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার। দীর্ঘস্থায়ী এই শুষ্ক আবহাওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে কোনো স্বস্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই মার্কিন ভূখণ্ডটির ৩৩ শতাংশের বেশি এলাকা বর্তমানে চরম খরা এবং আরও ৩০ শতাংশ এলাকা তীব্র খরার কবলে রয়েছে। রাজধানী সান জুয়ানের জন্য গত জুলাই মাসটি ছিল ১২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্কতম এবং পুরো দ্বীপের ইতিহাসে দ্বিতীয় উষ্ণতম মাস। পুয়ের্তো রিকোর গভর্নর জেনিফার গঞ্জালেজ জানান, তিনি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে মার্কিন কৃষি বিভাগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুর্যোগ ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। গভর্নর বলেন, “একেবারে শুরু থেকেই আমরা আমাদের কৃষকদের চাহিদার বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছিলাম।”
মার্কিন সরকারের এই ঘোষণার আওতায় পুয়ের্তো রিকোর মোট ৭৮টি পৌরসভার মধ্যে কাবো রোহো, পন্স, ইয়াউকো, আইবোনিটো এবং লারেসসহ ২৬টি পৌরসভা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই দুর্যোগ ঘোষণার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের কৃষক ও কৃষি উৎপাদনকারীরা জরুরি ভিত্তিতে ঋণ সহায়তার আবেদন করতে পারবেন। পুয়ের্তো রিকোর কৃষিমন্ত্রী আরভিং রদ্রিগেজ একে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “খরায় ক্ষতিগ্রস্ত সকল উৎপাদনকারীকে আমরা তাদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নথিবদ্ধ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
দীর্ঘ শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে অনেক কৃষক মে মাস থেকেই উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ফেলো পেরেজ। তিনি উত্তর ক্যারোলিনাভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা 'রাফি' (RAFI)-এর একজন কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী, যা দক্ষিণ-পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পুয়ের্তো রিকো এবং ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের সেবা দিয়ে থাকে। পেরেজ জানান, মাটি ও হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ করা কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া কফি, কোকো, কাঁচকলা ও কলার মতো ফলগুলো পানির অভাবে পাকার আগেই গাছ থেকে ঝরে পড়ছে। তিনি বলেন, “সময়ের আগেই ফসল তোলার সময় চলে এসেছিল।”
গবাদি পশু পালনকারীরাও চরম সংকটে পড়েছেন কারণ তারা পশুদের প্রয়োজনীয় খাদ্য জোগাতে পারছেন না। লোকসান এড়াতে তারা নামমাত্র মূল্যে অল্পবয়সী ষাঁড় বিক্রি করার চেষ্টা করলেও চলমান খরার কারণে কোনো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। মে মাস থেকে কৃষকরা ক্রমাগত লোকসান গুনছেন এবং একজন কৃষক তো সংসার চালাতে মেকানিকের পেশায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও পেরেজ জানান।
খরা পরিস্থিতির কারণে গভর্নর গঞ্জালেজ গত জুলাইয়ের শেষের দিকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন এবং পানি পরিবহন, বিতরণ ও বিশুদ্ধকরণের জন্য ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছিলেন। আগস্টের শুরুতে সান জুয়ান এবং আরও ছয়টি শহরের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পানি রেশনিং বা পর্যায়ক্রমিক সরবরাহের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর ফলে ঘূর্ণায়মান সূচি অনুযায়ী একবারে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পানিহীন থাকছেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার গ্রাহক। এসব এলাকায় বড় ট্রাকের মাধ্যমে পানি বিতরণ করা হচ্ছে, যেখানে হাসপাতাল এবং বয়স্কদের বাসস্থানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই খরার পেছনে রয়েছে 'এল নিনো' নামক একটি প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন চক্র, যা পার্শ্ববর্তী ইউএস ভার্জিন আইল্যান্ডসকেও প্রভাবিত করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে চরম খরার মুখে থাকা সেন্ট থমাস, সেন্ট জন এবং সেন্ট ক্রিক্স দ্বীপপুঞ্জের জন্যও মার্কিন সরকার খরা দুর্যোগ ঘোষণা করেছিল।
তবে কেবল খরা নয়, পুয়ের্তো রিকোর পানি সংকটের পেছনে জরাজীর্ণ অবকাঠামোও বড় কারণ। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার বাসিন্দা পানি সংকট ও কম চাপের সমস্যায় ভুগছেন। খরা পরিস্থিতির বাইরেও মে মাসের শেষের দিকে জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে সান জুয়ানের মেয়র মিগুয়েল রোমেরো দ্বীপের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। গভর্নরও স্বীকার করেছেন যে, দশকের পর দশক ধরে এই খাতের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল। এর আগে ২০২০ এবং ২০১৫ সালেও পুয়ের্তো রিকোতে পানি রেশনিং করা হয়েছিল, যখন প্রায় ৪ লাখ গ্রাহক কেবল প্রতি তিন দিন পর পর পানি পেতেন।

