১৯৯০-এর দশকের বসনিয়া যুদ্ধের সময় ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার জন্য দায়ী সাবেক বসনীয় সার্ব জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ হেগের জাতিসংঘ কারা হাসপাতালে মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএস (RTS) এবং বসনীয় সার্বদের আনুষ্ঠানিক টেলিভিশন চ্যানেল এই খবর নিশ্চিত করেছে।
পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাতকো ম্লাদিচের পরিবারের এক সদস্য এপি-র কাছে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ম্লাদিচের ছেলে দারকো ম্লাদিচ বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের হেগের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। তবে জাতিসংঘের আদালতের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এই মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতে পারেননি। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনাল ২০১৭ সালে ম্লাদিচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। দীর্ঘ বছর আত্মগোপনে থাকার পর ২০১১ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এই নীল চোখের সাবেক কমিউনিস্ট কর্মকর্তা পরবর্তীতে উগ্র জাতীয়তাবাদী যুদ্ধবাজ নেতায় পরিণত হন। ১৯৯২ সালে বসনিয়া যুদ্ধ শুরু হলে তিনি বসনীয় সার্ব বাহিনীর কমান্ডার হন এবং একটি পৃথক সার্ব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে দেশের বিশাল অংশ দখল করেন। তার বাহিনীর নৃশংসতায় ১ লাখের বেশি মানুষ নিহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ গৃহহীন হয়। ম্লাদিচ তার সেনাদের বসনীয় মুসলমানদের ‘মগজ পুড়িয়ে ফেলার’ নির্দেশ দিতেন এবং নিজেকে ‘সার্বিয়ান ঈশ্বর’ বলে দাবি করতেন। তার নির্দেশেই রাজধানী সারায়েভো অবরুদ্ধ করে স্নাইপার দিয়ে বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হয় এবং অ-সার্ব বেসামরিক নাগরিকদের জন্য কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প তৈরি করা হয়।
১৯৯৫ সালে ম্লাদিচের বাহিনী স্রেব্রেনিৎসায় ৮,০০০-এরও বেশি মুসলিম পুরুষ ও বালককে নির্মমভাবে হত্যা করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে একমাত্র স্বীকৃত গণহত্যা। জাতিসংঘের ঘোষিত এই ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ সার্ব বাহিনী প্রবেশ করে পুরুষদের আলাদা করে, তাদের পোশাক খুলতে বাধ্য করে এবং হত্যা করে গণকবরে মাটিচাপা দেয়। স্রেব্রেনিৎসার বেঁচে যাওয়া মানুষেরা আজও ভুলতে পারেন না কীভাবে ম্লাদিচ শহরের চত্বরে জড়ো করা মুসলিম শিশুদের মিষ্টি দিচ্ছিলেন, একজনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিলেন সব ঠিক হয়ে যাবে, অথচ তার পরক্ষণেই শুরু হয় সেই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। স্রেব্রেনিৎসা দখলের পর তিনি বলেছিলেন, ‘এই অঞ্চলে তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসেছে।’ তিনি বসনিয়ার মুসলমানদের ‘তুর্কি’ বলে সম্বোধন করতেন এবং এটিকে সার্বিয়ার ওপর ৫০০ বছরের অটোমান শাসনের প্রতিশোধ হিসেবে দেখতেন।
১৯৪২ সালের ১২ মার্চ সারায়েভোর ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে বোজিনোভিচি নামক একটি ছোট গ্রামে ম্লাদিচ জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবা ক্রোয়াটদের হাতে নিহত হন, যা তার মনে চরম জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। যুগোস্লাভিয়ার ভাঙনের সময় তিনি সার্বদের পক্ষ নেন। প্রথমে ক্রোয়েশিয়ায় সার্ব বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়ার পর তিনি সার্বিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোশেভিচের সমর্থনে বসনীয় সার্ব সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নেন। মিলোশেভিচও ২০০৬ সালে গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি থাকা অবস্থায় হেগের কারাগারেই মারা যান।
১৯৯৬ সালে জাতিসংঘের ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। প্রথমে তিনি পূর্ব বসনিয়ার হান পিয়েসাক নামক একটি পারমাণবিক হামলা প্রতিরোধী সামরিক ঘাঁটিতে স্ত্রী বোসার সাথে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি মৌমাছি ও ২৩টি ছাগল পালন করতেন, যার মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইটসহ তার অপছন্দের বিদেশি নেতাদের নামে ছাগলগুলোর নামকরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বেলগ্রেডে চলে যান এবং সেখানে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতেন, ছেলের বিয়েতে অংশ নিতেন, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় খেতেন এবং একটি যুগো (Yugo) গাড়ি চালাতেন। ২০০২ সালের পর তিনি পুরোপুরি আড়ালে চলে যান এবং ২০১১ সালের মে মাসে বেলগ্রেডের কাছে এক আত্মীয়ের সাধারণ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আমৃত্যু নিজের কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা ছিল না ম্লাদিচের। হেগের আদালতে বিচারের সময় তিনি বিচারকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আপনারা যা বলেছেন সব মিথ্যা। আপনাদের লজ্জা হওয়া উচিত!’ পলায়নের সময় একাধিক স্ট্রোক করা ম্লাদিচ বন্দিদশাতেও বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই কারাগারের হাসপাতালেই অবসান হলো বিংশ শতাব্দীর অন্যতম কুখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীর জীবনের।

