ইন্টারনেটের বহুল পরিচিত 'রুল ৩৪' (Rule 34) অনুযায়ী, কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকলে বা কল্পনা করা গেলে তা নিয়ে অনলাইনে পর্নোগ্রাফি থাকবেই। তবে একই সঙ্গে 'রুল ৩৫' (Rule 35) মনে করিয়ে দেয়—যেকোনো নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যতিক্রমহীনভাবে নারীদের হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। মেটার কন্টাক্ট লেন্স বা স্মার্টগ্লাসে ছোট ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন যুক্ত করার পর প্রদেয় সুবিধার অপব্যবহার শুরু হতে সময় লাগেনি। 'ম্যানফ্লুয়েন্সার' নামে পরিচিত কিছু কনটент ক্রিয়েটর জনসম্মুখে নারীদের সঙ্গে যেচে কথা বলার দৃশ্য গোপনে রেকর্ড করে তা টিকটকে আপলোড করতে শুরু করে। ইন্টারনেটে পরিচয় প্রকাশ পাওয়া এবং অপরিচিতদের দ্বারা হয়রানির শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত আক্রান্ত নারীরা প্রায়ই জানতেও পারেন না যে তাদের অজান্তে রেকর্ড করা হয়েছে। এই বিষয়ে মেটা কিছু নিষেধাজ্ঞা ও গোপনীয়তা সংক্রান্ত আপডেট আনলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে তাদের কার্যকর উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। এমনকি 'মেটা কানেক্ট ২০২৬' কি-নোটে মার্ক জাকারবার্গ প্রযুক্তিটির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের কাছে কোনো দুঃখপ্রকাশ করেননি।
প্রযুক্তির এই অপব্যবহার কেবল স্মার্টগ্লাসে সীমাবদ্ধ নেই। ফ্লক লাইসেন্স প্লেট ট্র্যাকিং সিস্টেম অপব্যবহার করে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য তাদের সাবেক সঙ্গিনী বা পরিচিত নারীদের অবস্থান নজরদারি করেছেন। অন্যদিকে, এআই ইমেজ জেনারেটর ব্যবহার করে তৈরি করা হচ্ছে ডিপফেইক পর্নোগ্রাফি। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইন্টারনেটে থাকা মোট ডিপফেইক ভিডিওর ৯৮ শতাংশই পর্নোগ্রাফি এবং তার ৯৯ শতাংশেই নারীদের অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এবার এই প্রযুক্তিভিত্তিক হয়রানি আরও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে লাইভস্ট্রিম করা 'রোবোগ্রোপিং' বা রোবটের মাধ্যমে শ্লীলতাহানির মাধ্যমে। জার্মানির কোলন শহরের পুলিশ সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনার তদন্ত করছে। সেখানে দুজন কিশোরের দূরনিয়ন্ত্রিত একটি হিউম্যানয়েড রোবট ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীকে অশালীনভাবে স্পর্শ করে এবং যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে। মানুষের পোশাক ও কৃত্রিম গোঁফ পরা ওই রোবটটির মাধ্যমে সংঘটিত পুরো ঘটনাটি অনলাইনে লাইভস্ট্রিম করা হচ্ছিল। পুলিশ রোবটটি বাজেয়াপ্ত করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে পুলিশের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ ধরনের ঘটনা তাদের জন্য একেবারেই নতুন এবং এ সম্পর্কিত পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা আগে কখনো হননি।
স্মার্টগ্লাসের তুলনায় ৭,৫০০ ডলারের এআই চালিত হিউম্যানয়েড রোবট কেনা এখনও ব্যয়বহুল হলেও এই প্রযুক্তি দ্রুত ৩টি বা তার বেশি ক্ষেত্রে মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে নিউইয়র্কের একটি স্কুল কৃত্রিম যৌন পুতুল তৈরি করা একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি 'স্যালি' নামের হিউম্যানয়েড রোবটকে শিক্ষক সহকারী হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে। জনরোষের মুখে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে বাধ্য হলেও ভবিষ্যতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোবটের ব্যবহার অনিবার্য হয়ে উঠছে। ব্যাংক অব আমেরিকার গত বছরের এক প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, উৎপাদন খরচ কমে আসায় ২০৩৫ সাল থেকে হিউম্যানয়েড রোবটের গণব্যবহার শুরু হবে। ২০৬০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটি হিউম্যানয়েড রোবট অবস্থান করবে, যা শিল্প খাতের ২০ শতাংশ এবং সেবা খাতের ৫০ শতাংশ কর্মসংস্থান দখল করবে।
সামাজিক ক্ষেত্রে ২৫ বছর বয়সী স্মিথ ও তাঁর ২৮ বছর বয়সী স্বামীর মতো পরিবারের খবর কিংবা ১৫ মিনিটের খ্যাতি না পাওয়া ব্যক্তির মাত্র ১৪ মিনিটের প্রথম প্রেস ব্রিফিং ব্যর্থ হওয়ার পর রোবট প্রতিস্থাপনের আলোচনার মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি খাতের এই বিকাশের সঙ্গে মানুষের চেয়ে রোবটের আইনি সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে আসছে। সম্প্রতি ফিলাডেলফিয়ায় উবারের একটি ডেলিভারি রোবটের পথ আটকে দেওয়ার অভিযোগে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অথচ একাধিক আদালতের নজির অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে না থাকা সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে পুলিশ আইনত বাধ্য নয়। এই বৈপরীত্য মানবসমাজ ও প্রযুক্তির ভবিষ্যতে এক অনিশ্চিত ও আশঙ্কাজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়।

