মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণত গণমাধ্যমকে চাপে রাখতে অভ্যস্ত, কিন্তু ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) এক্ষেত্রে ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিবিসির শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাসের কথা বলতে গেলে পেনেলেপি ফিটজেরাল্ডের ১৯৮০ সালে লেখা উপন্যাস 'হিউম্যান ভয়েসেস'-এর কথা আসে, যা ৪০ বছর আগের যুদ্ধকালীন পোর্টল্যান্ড প্লেসের প্রেক্ষাপটে রচিত। গত বছরের শেষভাগে বিবিসির প্যানোরামা অনুষ্ঠানের একটি পর্বের প্রেক্ষিতে ট্রাম্প ১০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল মানহানি মামলা দায়ের করেন। ওই অনুষ্ঠানে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির এক সমাবেশে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলোকে এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল যা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। বিবিসির ভাষ্যমতে, এটি ট্রাম্পকে সরাসরি সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার একটি ভুল ধারণা দিয়েছিল। যদিও বিবিসি তাদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে, তবে তারা প্রেসিডেন্টের এই আইনি লড়াইয়ের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে।
আমেরিকার অনেক গণমাধ্যম যেখানে ট্রাম্পের আইনি চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে, সেখানে বিবিসি তার নিজস্ব ধারায় অটল রয়েছে। ১৯৪০ সালের বসন্তে, নাৎসি আক্রমণের আশঙ্কার মুখে বিবিসি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সান্ত্বনার চেয়ে সত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিচারক বিবিসিকে ট্রাম্পের সন্তানদের ওপর আইনি নোটিশ জারি করার অনুমতি দিয়েছেন এবং সংস্থাটি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত জবানবন্দি নেওয়ার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করছে। গত বছরের আগস্টে ট্রাম্প আদালতকে অনুরোধ করেছিলেন যেন ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র এবং ইভাঙ্কা ট্রাম্পের জবানবন্দি নেওয়া বন্ধ করা হয়। তবে বিবিসি সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে তাদের আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্ভবত বুঝতে পারছেন না যে তিনি কার মুখোমুখি হয়েছেন। বিবিসি কোনো সাধারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি ব্রিটিশ জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিবিসি সংবাদ বা অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে যে প্রভাব তৈরি করে, তা কেবল অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। মার্কিন কর্পোরেট বা রাজনৈতিক মানসিকতায় বিবিসি যে ধরনের জেদি এবং কিছুটা অযৌক্তিক অবস্থান নিতে পারে, তা ট্রাম্পের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। বিবিসির ১৩ সদস্যের বিশেষ প্যানেল এই আইনি লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের দেশীয় অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক বড় বড় মার্কিন সংবাদমাধ্যম তার চাপের মুখে নতি স্বীকার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এবিসি নিউজ ট্রাম্পের সাথে ১৫ মিলিয়ন ডলারের একটি মানহানি মামলায় সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। সিবিএস-ও মানহানি মামলার জেরে স্টিফেন কোলবার্টের অনুষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। এছাড়া ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন (এফসিসি) ট্রাম্পের সমালোচক গণমাধ্যমগুলোর লাইসেন্স পর্যালোচনার হুমকি দিয়েছে, যা মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিবিসি এই ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে অভ্যস্ত নয়। যদিও তাদের ওপর আর্থিক চাপ রয়েছে, তবে জনস্বার্থে পরিচালিত সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কেবল অর্থের ওপর নির্ভরশীল নয়। দীর্ঘ ইতিহাসে বিবিসি অনেক বড় বড় শত্রুর মোকাবিলা করেছে এবং এবারও তারা ট্রাম্পের এই আইনি লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।

