ইউরোপজুড়ে চলমান তীব্র তাপদাহের কারণে দানিয়ুব নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে রোমানিয়া তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
চেরনাভোদা নামের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দুটি চুল্লি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালক রোমিও উরজান ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন না। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার ঠিক আগে চেরনাভোদার ৭০৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় চুল্লিটি জাতীয় গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এর আগে গত জুলাই মাসেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম চুল্লিটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। চেরনাভোদা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি রোমানিয়ার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে থাকে। এর আগে কেবল ২০০৩ সালে একবার এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করা হয়েছিল।
দানিয়ুব নদীর পানি ব্যবহার করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিগুলো ঠান্ডা রাখা হতো। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পানির প্রবাহ বাড়াতে নদীতে পাথর বোঝাই বার্জ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিয়েছিল কর্তৃপক্ষ, কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি।
এদিকে প্রতিবেশী হাঙ্গেরি তাদের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘পাকস’ এখনও চালু রাখতে পেরেছে, যা শীতলীকরণের জন্য দানিয়ুবের পানির ওপরই নির্ভরশীল।
তবে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগিয়ার গত মাসে সতর্ক করেছিলেন যে, সোভিয়েত আমলের চার চুল্লিবিশিষ্ট এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দানিয়ুবের পানি এতটাই নিচে নেমে গেছে যে পানি টানার পাইপগুলো আর নাগাল পাচ্ছে না। ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম এই নদীর পানি বিভিন্ন দেশে গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে।
পানি কমে যাওয়ায় নদীগর্ভ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার নিমজ্জিত যুদ্ধজাহাজ, সেনাদের দেহাবশেষ এবং মোটরসাইকেলও বেরিয়ে এসেছে।
রোমানিয়ায় বিদ্যুতের এই ঘাটতি মেটাতে দিনের বেলা সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে সন্ধ্যার পর কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানি করতে হবে। সাধারণত রোমানিয়ার বড় জলবিদ্যুৎ সক্ষমতা থাকলেও নদীর পানি কমে যাওয়ায় সেটিও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে, তবে ইউরোপে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট সার্ভিসের মতে, ইউরোপ বিশ্ব গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপদাহ, পানির সংকট এবং ভয়াবহ দাবানলের মতো ঘটনা বাড়ছে।
ইউরোপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রাইন নদীর পানির স্তরও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মহাদেশটির কৃষি খাতেও।
ফ্রান্সের পরিবেশ মন্ত্রী মনিক বারবুট সতর্ক করেছেন যে, সাম্প্রতিক তাপদাহের কারণে দেশটির সরাসরি ও পরোক্ষ ক্ষতি ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। ডাচ ব্যাংক ট্রায়োডোস জানিয়েছে, এই চরম গরম ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশন যেখানে ১.১ শতাংশ এবং আইএমএফ ইউরোজোনে ০.৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা এখন হুমকির মুখে।
বর্তমানে ফ্রান্সের ৮০টি বিভাগে তাপদাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক দাবানলে ফ্রান্সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া স্পেনের মধ্যাঞ্চলে গত বৃহস্পতিবার ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও গত বৃহস্পতিবার বছরের উষ্ণতম দিন রেকর্ড করা হয়, যেখানে লন্ডনের কিউ গার্ডেনে তাপমাত্রা ছিল ৩৮.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে দাবানলে বেশ কয়েকজন আহত এবং চারটি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।

