যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ক্রেমলিন-বিরোধীদের হত্যার ছক উন্মোচনের পর নির্বাসিত রুশ ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের একটি সাম্প্রতিক অভিযোগপত্র প্রকাশের পর বিশ্লেষক ও নির্বাসিতরা মনে করছেন, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সম্ভবত তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সীমানায় হামলা না চালানোর দীর্ঘদিনের অলিখিত নিয়ম বা ‘ভদ্রলোকের চুক্তি’ ভেঙে ফেলেছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল পতাকা হোক বা ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়ান ফেডারেশনের ত্রিবর্ণ পতাকা—ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে কথা বলা ব্যক্তিদের জন্য মার্কিন মাটি ঐতিহ্যগতভাবেই একটি নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সালে লন্ডনে বিষাক্ত ছাতা দিয়ে হামলা চালানোর মতো ঘটনা ঘটিয়ে ক্রেমলিন এজেন্টরা পার পেয়ে গেলেও মার্কিন মাটিতে এমন কিছু করা অসম্ভব বলে মনে করা হতো। কিন্তু এই সপ্তাহে যেন পুরো দৃশ্যপট ওলটপালট হয়ে গেছে। ৪৩ বছর বয়সী রোমান দোব্রোখোভতভ বলেন, "মনে হচ্ছে আজ থেকে আমেরিকায় নিয়ম বদলে গেছে। সেখানে আমাদের আচরণ পরিবর্তন করতে হবে। এখন আর কোনো জায়গাই নিরাপদ নয়।"
সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ অনুপস্থিতিতে পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা এই ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে হামলা ও হত্যাকাণ্ড চালানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবিটি হলো, ওয়াশিংটন ডিসিতে বসবাসরত এক বিশিষ্ট রুশ ভিন্নমতাবলম্বীকে নির্মূল করার জন্য মার্কিন নাগরিকদেরই ভাড়া করার একটি দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করেছিল তারা।
এই ষড়যন্ত্রে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রুশ ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসের (এফএসবি) বর্তমান কর্মকর্তা কিরিল ক্রামেভ (২৭), তার বাবা ও সাবেক এফএসবি কর্নেল ইউরি ক্রামেভ (৬৩), দুই কিউবান নাগরিক ওএমিস রোমাগোজা দুরুতি (৩৫) ও ইয়াইদেল দেলগাদো সুয়ারেজ (ওরফে দ্য ভাইকিং) এবং ভেনিজুয়েলার ২২ বছর বয়সী তরুণ অ্যাঞ্জেল এদুয়ার্দো কাস্ত্রো। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, মেক্সিকো থেকে খুনি নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হলেও তারা আসতে দেরি করায় স্থানীয় খুনি খোঁজা হয়েছিল। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সাইবেরিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ২০২৪ সালে বন্দি বিনিময়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ভ্লাদিমির কারা-মুর্জার নাম শোনা গেলেও তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে রাশিয়ার এমন তৎপরতা নজিরবিহীন। অভিযোগপত্রেই রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পূর্ববর্তী কিছু হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৪ সালে মস্কোয় মার্কিন সাংবাদিক পল ক্লেবনিকভ হত্যা, ২০০৬ সালে লন্ডনে সাবেক এফএসবি কর্মকর্তা আলেকজান্ডার লিটভিনেঙ্কোকে বিষপ্রয়োগে হত্যা, ২০১৮ সালে স্যালসবরিতে সাবেক রুশ সামরিক গোয়েন্দা সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার মেয়ের ওপর রাসায়নিক হামলা (যাতে ডন স্টার্জেস নামের এক স্থানীয় নারী মারা যান), ২০১৯ সালে বার্লিনে চেচেন যুদ্ধের সাবেক কমান্ডার জেলিমখান খাঙ্গোশভিলি হত্যা এবং ২০২৪ সালে কারাগারে বিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনির মৃত্যু। এছাড়া সম্প্রতি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানিতে লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ওয়াশিংটনের ইন্টারন্যাশনাল স্পাই মিউজিয়ামের নির্বাহী পরিচালক ক্রিস কোস্টা বলেন, আমি একে স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের একটি অলিখিত নিয়ম হিসেবে বর্ণনা করব। যুক্তরাষ্ট্র ওসোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরের বিরুদ্ধে আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তি চালালেও, একে অপরের গোয়েন্দা কর্মী বা তাদের পরিবারকে শারীরিকভাবে লক্ষ্যবস্তু না করার একটি অলিখিত সীমা ছিল। তিনি মনে করেন, মার্কিন মাটিতে হত্যার নির্দেশ দেওয়া ঐতিহ্যবাহী গুপ্তচরবৃত্তির সীমা অতিক্রম করে।
সিআইএ-এর সাবেক সহযোগী পরিচালক জ্যাক ডিভাইন মনে করেন, ক্রেমলিন হয়তো আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া বা নিষেধাজ্ঞার পরোয়া করা ছেড়ে দিয়েছে, যা পুতিনের একটি বড় ভুল হতে পারে। অন্যদিকে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারের ইন্টেলিজেন্স প্রজেক্টের সহকারী পরিচালক ক্যাল্ডার ওয়ালটন ২০২৩ সালে প্রকাশিত তার 'স্পাইজ' (Spies) বইয়ে প্রকাশ করেন যে, এর তিন বছর আগে (২০২০ সালে) মার্কিন মাটিতে বসবাসকারী রুশ দলছুট আলেকজান্ডার পোটেয়েভকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল রাশিয়ার একটি কিলিং স্কোয়াড। তখন মার্কিন প্রশাসন বিষয়টি গোপন রাখলেও এবার অভিযোগপত্র জনসমক্ষে এনে ক্রেমলিনের নেটওয়ার্ক উন্মোচন এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের আশ্বস্ত করার কৌশল নিয়েছে।
এই ঘটনার পর ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। 'অবাঞ্ছিত সংগঠন'-এ অংশ নেওয়ার নতুন আইনে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০২২ সালে রাশিয়া থেকে পালিয়ে লিথুয়ানিয়ায় চলে যাওয়া পুতিন-বিরোধী কর্মী আনাস্তাসিয়া শেভচেঙ্কো জানান, সম্প্রতি মার্কিন ভিসার সাক্ষাৎকারের সময় তাকে সতর্ক করা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রেও তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ নাও থাকতে পারেন। নিউ ইয়র্কের সোফান সেন্টারের গবেষক নিকি লিউবারস্কি মনে করেন, পর্দার আড়ালে ওয়াশিংটন ও ক্রেমলিনের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলেই এই অভিযোগপত্র জনসমক্ষে আনা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রাগ সফরের সময় সন্দেহভাজন বিষপ্রয়োগের শিকার হওয়া এবং এর পেছনে ক্রেমলিনের হাত রয়েছে বলে বিশ্বাস করা ফ্রি রাশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা নাটালিয়া আরনো বলেন, "আমরা ভেবেছিলাম ক্রেমলিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কিছু করার মতো এতটা দুঃসাহস দেখাবে না। কিন্তু এখন দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে।"

