কেপ টাউনে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার তিন ম্যাচ সিরিজের রোমাঞ্চকর শেষ টেস্ট গড়াল পঞ্চম দিনে। দ্বিতীয় ইনিংসে রায়ান রিকেলটন ও উইয়ান মুল্ডারের অসাধারণ জোড়া সেঞ্চুরিতে ভর করে ৩৮৭ রানে অলআউট হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ফলে জয়ের জন্য সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার সামনে দাঁড়িয়েছে ২৮৮ রানের লক্ষ্য। শনিবার শেষ দিনে অন্তত ৯০ ওভারের খেলায় জয়ের জন্য অজিদের প্রয়োজন ২৮৮ রান, আর সিরিজ নিজেদের করে নিতে প্রোটিয়াদের দরকার ১০টি উইকেট।
চলতি শতকে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কোনো সিরিজের তিনটি টেস্টের সবকটি ম্যাচই পঞ্চম দিনে প্রবেশ করল। তাছাড়া গত ৩২ বছরে এই প্রথম দেশটির মাটিতে তিন টেস্টের সিরিজের কোনো ম্যাচ ড্রতে শেষ হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টি-টোয়েন্টির ব্যাপক প্রভাবের যুগেও লাল বলের এই ধ্রুপদী লড়াই দর্শকদের মাঝে বাড়তি উন্মাদনা তৈরি করেছে। শেষ দিনের সমীকরণ নিয়ে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে রায়ান রিকেলটন বলেন, "যদি কেউ বলত যে তৃতীয় টেস্টের পঞ্চম দিনে গিয়ে শেষ হবে এবং দুই দলের জন্যই জয়ের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে, আমি হয়তো বিশ্বাসই করতাম না। এটি সত্যিই একটি বিশেষ সিরিজ। তিনটি ম্যাচেই খেলা দারুণভাবে ওঠানামা করেছে। উভয় দলই কখনো এগিয়ে গেছে, আবার অন্য দলটি পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়েছে। দারুণ ভুল ও অসাধারণ সব নৈপুণ্যে ভরা এক উপভোগ্য সিরিজ হচ্ছে এটি।"
বৃহস্পতিবার নিউল্যান্ডসে তৃতীয় দিনের খেলা শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ৪০ রানে এগিয়ে থাকলেও মাত্র ৪ উইকেট হাতে রেখে বেশ চাপে ছিল। কিন্তু শুক্রবার চতুর্থ দিনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেন রিকেলটন ও মুল্ডার। লাঞ্চের আগের নবম ওভার থেকে শুরু করে চায়ের বিরতির এক ঘণ্টা পর পর্যন্ত ক্রিজে টিকে থেকে এই জুটি যোগ করেন ১৫৪ রান। এই দীর্ঘ জুটির পতন ঘটে রিকেলটনের দুর্ভাগ্যজনক রান আউটে। রান নিতে রিকেলটন দৌড়ে গেলেও অন্য প্রান্ত থেকে মুল্ডার সাড়া দেননি। রসিকতা করে রিকেলটন বলেন, "উইয়ান আমাকে রান আউট করার আগ পর্যন্ত সবকিছু দারুণ চলছিল, তারপর আমি কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম।"
জোহানেসবার্গের এই দুই ক্রিকেটার সেন্ট স্টিথিয়ান্স কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং ঘরোয়া দল লায়ন্সের দীর্ঘদিনের সতীর্থ। বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে লায়ন্স ও জাতীয় দলের হয়ে একসাথে প্রচুর ক্রিকেট খেলার কারণে উইকেটে দুজনের বোঝাপড়া ছিল অত্যন্ত নিবিড়।
রান আউট হলেও নিউল্যান্ডসের মাঠে নিজের স্মরণীয় রেকর্ড ধরে রেখেছেন রিকেলটন। এই ভেন্যুতে খেলা প্রথম তিনটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। চতুর্থ ম্যাচে এসে ২১৯ বল খেলে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ক্রিজে থেকে ১০১ রানের ইনিংস খেলেন। কেপ টাউনের ফ্ল্যাট উইকেট ও এখানকার মনোরম পরিবেশ তাঁর ব্যাটিং উপভোগের বড় কারণ বলে জানান তিনি। টানা ১৩টি ইনিংসে শতকের মুখ না দেখা রিকেলটন এই ইনিংসে চরম ধৈর্যের পরিচয় দেন। বিশেষ করে ৯০ থেকে ১০০ রানের ঘরে পৌঁছাতে তিনি খেলেছেন ৩৭টি বল, যেখানে প্যাট কামিন্সের শর্ট লেগ ফিল্ডারসহ অনবরত বাউন্সার তিনি বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নরম হাতে ডিফেন্স করে নিচে পাঠিয়ে দেন।
রিকেলটন যখন আউট হন, তখন দক্ষিণ আফ্রিকার লিড ছিল ২২৫ রান। তবে তাঁর বিদায়ের পরপরই প্রোটিয়াদের নিম্নমানের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে। মাত্র ৩৬ বলের ব্যবধানে ১৬ রান যোগ করতেই প্যাভিলিয়নে ফেরেন মার্কো জানসেন, সাইমন হার্মার ও জেরার্ড কোয়েটজি। তবে অপর প্রান্তে অদম্য লড়াই চালিয়ে যান উইয়ান মুল্ডার। শেষ ব্যাটার কাগিসো রাবাদাকে সঙ্গে নিয়ে সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে যান তিনি। স্ট্রাইক ধরে রেখে ইনিংস বড় করার স্বার্থে দুই ব্যাটারকেই কয়েকটি সিঙ্গেল প্রত্যাখ্যান করতে দেখা যায়। অবশেষে নাথান লায়নকে কাভারের ওপর দিয়ে দারুণ ড্রাইভে দুই রান নিয়ে শতক পূর্ণ করেন মুল্ডার।
সেঞ্চুরিতে পৌঁছানোর পরেই বাতাসে ঘুসি উঁচিয়ে উল্লাস করেন মুল্ডার, এরপর হেলমেট খুলে দ্য ওকস স্ট্যান্ডের দিকে হেঁটে গিয়ে মেঘলা আকাশের দিকে মুখ তুলে ধরেন। ব্যক্তিগতভাবে কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া মুল্ডারের বাবা পিটার মুল্ডার গত এপ্রিলে প্রয়াত হন। এছাড়া এই সিরিজের প্রথম চার ইনিংসের তিনটিতেই শর্ট বলে আউট হয়েছিলেন তিনি। তবে সেই ব্যর্থতা পেছনে ফেলে কামিন্স ও অজি বোলারদের বাউন্সার সতর্কতার সাথে হাঁটু গেড়ে ও নিচু হয়ে ছেড়ে দেন। সতীর্থের এই শতক নিয়ে রিকেলটন বলেন, "উইয়ান স্বভাবজাতভাবে আক্রমণাত্মক এবং প্রযুক্তিগতভাবে বেশ শক্ত ব্যাটার। আজ সে কিছু অসাধারণ শট খেলেছে যা খুব কম ব্যাটারই খেলতে পারে। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যক্তিগত রানের চেয়ে উইকেটে পার্টনারশিপ বড় করা, যা আমরা করতে পেরেছি।"
সেঞ্চুরি করার পর আরও আগ্রাসী রূপ নেন মুল্ডার। তিনি কামিন্সকে পুল করে একটি এবং লায়নকে স্লগ-সুইপ করে আরেকটি ছক্কা হাঁকান। পরবর্তীতে দিনের শেষ বলে কামিন্সকে লং-অনের ওপর দিয়ে আবারও ছক্কা মারতে গিয়ে সীমানার কাছে ১১৫ রানে ক্যাচ আউট হন। এর মাধ্যমেই ৩৮৭ রানে শেষ হয় দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় ইনিংস।
নিউল্যান্ডসে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন ২৮৮ রানের বড় লক্ষ্য। এই মাঠে এটি অর্জিত হলে তা হবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া করার রেকর্ড। এর আগে ২০১১ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেই ২৩৬/২ রান তুলে ম্যাচ জিতেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, যা বর্তমানে এই মাঠের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল তাড়া। আর নিউল্যান্ডসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ডটি গড়েছিল এই অস্ট্রেলিয়াই, যখন ২০০২ সালের মার্চে তারা ৩৩৪/৬ রান করে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। ফলে কেপ টাউন টেস্টের পঞ্চম দিনে এক অসাধারণ ক্রিকেট রোমাঞ্চের অপেক্ষায় রয়েছে ক্রীড়াবিশ্ব।

