বিশ্বের চোখের সামনে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলা হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ১০০ জনেরও বেশি সাবেক কূটনীতিক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্য ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নিজেদের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা, যাতে ইসরায়েল একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মেনে নিতে বাধ্য হয়।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কাছে পাঠানো এক অভূতপূর্ব যৌথ চিঠিতে সাবেক কূটনীতিকরা কোনো কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহার না করেই সরাসরি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধনের’ অভিযোগ এনেছেন। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্ব এখন আর ইসরায়েলকে একটি প্রকৃত গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে না।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ৫২ জন ফরাসি সাবেক কূটনীতিক এবং ৫০ জন ব্রিটিশ সাবেক রাষ্ট্রদূত। তাঁদের মধ্যে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যে—বিশেষ করে মিসর, ইরান, বাহরাইন, ইসরায়েল, সিরিয়া, তুরস্ক, কুয়েত, সৌদি আরব ও কাতারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্রিটিশ স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে জাতিসংঘের সাবেক দুই দূত জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোন্স প্যারি এবং ফরেন অফিসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক পরিচালক এডওয়ার্ড চ্যাপলিন রয়েছেন। ফরাসি স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক পরিচালক প্যাট্রিস পাওলি এবং জেরুজালেমে নিযুক্ত সাবেক কনসাল জেনারেল স্ট্যানিস্লাস ডি লাবুলে।
সম্প্রতি পশ্চিম তীরে ১,২০০টি বাড়ি নির্মাণের জন্য ‘ই১’ (E1) বসতি প্রকল্পের দরপত্র প্রকাশ করে ইসরায়েল সরকার। এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ ১১টি দেশ একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার দুই দিন পর কূটনীতিকদের এই চিঠিটি প্রকাশ্যে আসে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড এই বসতি প্রকল্পকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য একটি ধ্বংসাত্মক হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইসরায়েলের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড্যানিয়েলা গ্রুডস্কি একস্টাইনকে তলব করেছেন। এর জবাবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদন সার দাবি করেছেন, যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশদের যেমন বসবাসের অধিকার রয়েছে, তেমনি সমগ্র ইসরায়েলে ইহুদিদেরও বসবাসের অধিকার রয়েছে।
কূটনীতিকদের ধারণা, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামরিক ও রাজনৈতিক উস্কানির মাধ্যমে অন্যান্য দেশকে এমন কোনো পাল্টা পদক্ষেপে প্ররোচিত করতে চাইছেন, যা আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে তাঁর জয়ের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেবে।
সাবেক কূটনীতিকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য এখন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তাঁরা লিখেছেন, ‘আমাদের সরকারগুলো যেমন ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তেমনি ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলা নিপীড়নেও তারা স্তম্ভিত। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস জঘন্য অপরাধ করেছিল, কিন্তু তার মানে এই নয় যে ইসরায়েল গাজা ও সেখানকার জনগণকে এভাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করবে। নেতানিয়াহুর এই নীতি ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিপন্ন করছে এবং আলোচনার কোনো পথ রাখছে না।’
চিঠিতে কূটনীতিকরা আরও উল্লেখ করেন, গাজায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূমির মাত্র ৩০ শতাংশের মধ্যে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যেখানে তারা খাদ্য, ওষুধ ও বাসস্থানের তীব্র সংকটে ভুগছেন। তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকেও সেখানে ১,২০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের মদদে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা মূলত জাতিগত নিধনেরই শামিল। এই ধ্বংসযজ্ঞের পরিধি এখন লেবানন ও সিরিয়াতেও বিস্তৃত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কূটনীতিকরা যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সরকারের প্রতি সাতটি নির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন:
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) সিদ্ধান্তগুলো মেনে চলা।মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তি এবং যুক্তরাজ্য-ইসরায়েল বাণিজ্য ও অংশীদারিত্ব চুক্তি স্থগিত করা।ইসরায়েলের সাথে সব ধরনের অস্ত্র স্থানান্তর এবং দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করা।জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা (UNRWA), অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর মাধ্যমে গাজায় অবাধে ত্রাণ পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং সেখানে সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া।ইসরায়েলি বসতিগুলোতে উৎপাদিত পণ্য, বিনিয়োগ, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সেবা সংক্রান্ত সব ধরনের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা।‘ই১’ বসতি বা অন্য কোনো অবৈধ বসতি নির্মাণে অর্থায়নকারীদের সতর্ক করা যে, এর ফলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।ব্রিটিশ ও ফরাসি নাগরিকদের জন্য ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে দখল করা জমিতে সম্পত্তি কেনা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং বসতি নির্মাণে অর্থায়ন করা তথাকথিত ‘দাতব্য সংস্থা’গুলোর করমুক্ত সুবিধা বাতিল করা।একই সাথে কূটনীতিকরা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদেরও নিশ্চিত করতে হবে যে তাদের রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক ও আইন মেনে চলা একটি রাষ্ট্র হবে। গাজা ও পশ্চিম তীরকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনরায় একত্রিত করতে হবে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ফিলিস্তিনকে একটি পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দুই দেশের সরকার অনেক কিছু করতে পারলেও, মূল মনোযোগ দিতে হবে ইসরায়েলের সেই আগ্রাসী মনোভাবের দিকে যা এই সম্ভাবনাকে ধ্বংস করতে চাইছে।

