যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় একটি ছয় দিনের যুদ্ধবিরতি ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন শহরে এক বিরল প্রশান্তি বয়ে এনেছে। রুশ-অধিকৃত ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর লক্ষ্যে ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতি পার্শ্ববর্তী ইউক্রেনীয় নিয়ন্ত্রিত খেরসন এলাকাতেও প্রভাব ফেলেছে। মঙ্গলবার ভোর ৩টা থেকে শুরু হওয়া এই সাময়িক বিরতি ওলেশকির প্রায় ২,০০০ বাসিন্দার জন্য খাদ্য, ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি করেছে। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট চলছে এবং ড্রোন ও ল্যান্ডমাইনের কারণে বাসিন্দাদের চলাফেরা সীমিত হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ চার বছর আগে খেরসনের মানুষ রুশ দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির আনন্দ উদযাপন করেছিল, কিন্তু এরপর থেকে শহরটি যুদ্ধের নতুন সম্মুখভাগে পরিণত হয়েছে। দিনিপ্রো নদীর ওপার থেকে রুশ বাহিনীর নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলায় শহরটি বিপর্যস্ত। তবে এই যুদ্ধবিরতির ফলে বুধবার শহরটিতে স্বাভাবিক জনজীবন কিছুটা ফিরে আসতে দেখা গেছে। অনেক বাসিন্দা দীর্ঘ দিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন, কেউবা শীতের প্রস্তুতির জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করছেন। ৬১ বছর বয়সী হানা লিয়ান্না প্রায় দুই বছর পর শহরের কেন্দ্রে কফি খেতে বেরিয়েছিলেন, যদিও নদীর কাছের এলাকাগুলোতে যেতে তিনি এখনো আতঙ্ক বোধ করেন। তিনি জানান, যুদ্ধের ক্ষতগুলো আবার ফিরে এলে তা সহ্য করা কঠিন হবে।
শহরটির অনেক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে; প্লাইউড দিয়ে জানালা ঢাকা এবং কাঁচের ভাঙা টুকরো সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। অনেক ভবন ও দোকানপাট বছরের পর বছর বন্ধ। তবে এই যুদ্ধবিরতির সুযোগে মিউনিসিপ্যালিটির কর্মীরা ড্রোন থেকে সুরক্ষার জন্য জাল মেরামতের কাজ করছেন। আন্তন শাখুনভ নামের এক বাসিন্দা জানান, তিনি তার ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে স্মৃতি হাতড়ে বেড়িয়েছেন, যেখানে আগে তিনি থাকতেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রুশ বাহিনীর ড্রোন আক্রমণ তার সাজানো জীবন কেড়ে নিয়েছে। তিনি বলেন, 'এখানেই রুশ বিশ্বের সৌন্দর্য দেখা যায়, এই অ্যাপার্টমেন্টের সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।'
খেরসনের বাসিন্দাদের কাছে রুশ এফপিভি (FPV) ড্রোন এখনো প্রধান ভয়ের কারণ। লিউদমাইলা শেভচেঙ্কো এবং তার স্বামী ওলেক্সি ক্রশচেঙ্কো জানান, ড্রোন না থাকায় মানুষ এখন কিছুটা চলাফেরা করতে পারছেন। শেভচেঙ্কো জানান, ড্রোন আতঙ্কে আগে তিনি বাইরে বের হতে পারতেন না, কিন্তু এখন বাগানের পরিচর্যা করার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বাগানে টিউলিপ রোপণ করেছেন এবং আঙুর গাছ ছেঁটেছেন। তবে এই শান্তি স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে গভীর সন্দেহ রয়েছে। অনেকে মনে করছেন, রাশিয়া এই বিরতিকে অস্ত্র ও সৈন্য পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করতে পারে।
সামরিক সূত্র জানিয়েছে, দূর থেকে শোনা যাওয়া বিস্ফোরণের শব্দ মূলত মাইন অপসারণের কাজ। তবে রুশ বাহিনীর রিমোটলি ছড়ানো মাইন এখনো বড় হুমকি। মঙ্গলবার একজন সামরিক প্রেস অফিসার মাইন বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। ওলেক্সান্দ্রা কোস্তেনকো ও ইউলিয়া ওরলোভার মতো অনেক বাসিন্দা মনে করেন, এই সাময়িক শান্তি হয়তো ওলেশকির মানুষের জন্য সহায়ক হবে, কিন্তু খেরসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা এখনো শঙ্কিত। ইউলিয়া ওরলোভা জানান, তিনি ও তার স্বামী শহর ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন, কারণ খেরসনের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলে তারা মনে করেন।

