ইরানে দুটি পৃথক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৭৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহতের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছে বলে বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি নতুন প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চালানো ওই হামলাগুলো ছিল মূলত নির্বিচার আক্রমণ, যা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ল্যামের্ডে হামলার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং মিনাবের ঘটনার তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করেন না। একই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন, গত জানুয়ারি মাসে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভ দমনে ইরানের কর্তৃপক্ষও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে।
দেশটির ৩১টি প্রদেশেই নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো হত্যাকাণ্ডকে "নজিরবিহীন ও স্তম্ভিত করার মতো" বলে বর্ণনা করেছেন তারা। ইরান এই প্রতিবেদনের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে অতীতে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পদ্ধতিগত নির্যাতনের অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, "ইরানের সাধারণ মানুষ একদিকে তাদের নিজস্ব সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে দেশটির মারাত্মক সংঘাতের মাঝে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে।"
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়্যেবাহ প্রাইমারি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, এই হামলায় অন্তত ১৫৬ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১২০ জনই ছিল শিশু।
বিশেষজ্ঞরা জানান, স্কুলটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) একটি নৌ ঘাঁটির পাশেই অবস্থিত ছিল, যেটিতে ওই দিন হামলা চালানো হয়েছিল। তবে স্কুলটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো ছিল এবং এটি সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছিল এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, স্কুলটিতে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রটি ছিল টমাহক, যা এই সংঘাতের সময় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই রয়েছে। এছাড়া মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তেও তাদের বাহিনীর দায় স্বীকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, স্কুলটিতে পরপর দুবার আঘাত করা হয়েছিল।
ফলে এটি কোনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হামলা বা আইআরজিসি ঘাঁটিতে হামলার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না, বরং স্কুলটিই ছিল হামলার মূল লক্ষ্য। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ অবশ্য দাবি করেছেন যে তারা "কখনও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাবে না", তবে মিনাব হামলার বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর তদন্ত প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
একই দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের ল্যামের্ড শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও আবাসিক এলাকায় প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) থেকে টাংস্টেন পেলেট বা ধাতব দানা বর্ষণ করা হয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, এতে ৭ শিশুসহ অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই হামলায় অনিতা ঘাসেমি নামে এক নারী গুরুতর আহত হন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এই ক্রীড়া কমপ্লেক্সটিও স্পষ্টভাবে চেনা যেত এবং এখানে কোনো সামরিক কার্যক্রমের প্রমাণ ছিল না। পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকায় এই হামলার পেছনেও মার্কিন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার জোরালো প্রমাণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ল্যামের্ডে কোনো হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে এবং ব্যবহৃত অস্ত্রটি পিআরএসএম ছিল না বলে দাবি করেছে। উভয় ঘটনার ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নির্বিচার হামলা চালিয়ে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও ক্ষতি করার যুদ্ধাপরাধের যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি রয়েছে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভে ইরানি কর্তৃপক্ষের সহিংস দমনপীড়নের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে অতীতে ঘটে যাওয়া দমনপীড়নের চেয়েও ভয়াবহ এক নজিরবিহীন তীব্রতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে নির্বিচারে প্রাণঘাতী বলপ্রয়েরাগ, গণগ্রেপ্তার ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্বাস্থ্যকর্মী এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ভবনের ছাদ এবং উঁচু স্থানগুলোতে অবস্থান নিয়ে সরাসরি জনতার ওপর অ্যাসাল্ট রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়েছিল। এছাড়া বিক্ষোভকারীদের মাথা, বুক ও চোখ লক্ষ্য করে মেটাল শটগান পেলেট ছোড়া হয়, যার ফলে অনেকেই স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে গেছেন।
নিরাপত্তা বাহিনী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতেও হামলা চালিয়ে আহত বিক্ষোভকারীদের মারধর ও গ্রেপ্তার করে এবং চিকিৎসকদেরও আটক করে। এর ফলে অনেক আহত ব্যক্তি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা নিতে ভয় পাচ্ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভের সময় আটক হওয়া হাজার হাজার মানুষকে নির্জন কারাবাস, নির্যাতন এবং আইনি সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া সরকার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি বিচার করে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং এ পর্যন্ত অন্তত ২৯ জন পুরুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
বিক্ষোভ দমনে মোট নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারিভাবে ঘোষিত ৩,০০০ নিহতের সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরান সরকার দাবি করেছিল যে নিহতদের বড় অংশই ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা পথচারী। তবে মার্কিন ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হারানা (হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি) নিশ্চিত করেছে যে এই দমনপীড়নে ৭,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের প্রায় সবাই বিক্ষোভকারী।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা উপসংহারে বলেছেন, ইরানি কর্তৃপক্ষের এই কর্মকাণ্ড বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত ও ব্যাপক আক্রমণের অংশ, যা হত্যা, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং অমানবিক আচরণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। অন্যদিকে, ইরান সরকার এই অশান্তির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে এবং নিহতদের "সন্ত্রাসী" ও "দাঙ্গাকারী" বলে অভিহিত করেছে।

