১৯৬২ সালের স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্রাজিলের বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গুলার্তের বিরুদ্ধে সিআইএ এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে গোপনে কোটি কোটি ডলার খরচ করে ডানপন্থী প্রচার চালিয়েছিল, ২০২৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে ঠিক তেমনই এক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও রুবিওর এই প্রচেষ্টা ৬৪ বছর আগের সিআইএ হস্তক্ষেপের ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি।
আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মুখোমুখি হচ্ছেন কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ফ্লাভিও হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে, যিনি সামরিক অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে ২৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে যে, ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লুলার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে বলসোনারোর পক্ষে নির্বাচনের পাল্লা ভারী করার চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের এই কৌশলের সাথে ১৯৬৪ সালের অভ্যুত্থানের পূর্বে ওয়াশিংটনের স্নায়ুযুদ্ধকালীন হস্তক্ষেপের মিল রয়েছে, যা ব্রাজিলে দুই দশকের স্বৈরশাসন ডেকে এনেছিল।
এই হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের অধিকাংশ আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে এবং রিও ডি জেনিরোর 'রেড কমান্ড' ও সাও পাওলোর 'ফার্স্ট কমান্ড অব দ্য ক্যাপিটাল'-এর মতো অপরাধী চক্রগুলোকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ব্রাজিলের কর্মকর্তাদের ধারণা, লুলার সরকারকে অপরাধ দমনে দুর্বল দেখানোর জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে, ব্রাজিলের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সংশয় ছড়ানোর পরিকল্পনার অভিযোগে ট্রাম্পের দুই কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায় ব্রাজিল সরকার। এর জবাবে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের ভিসাও বাতিল করে মার্কিন প্রশাসন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সেলসো রোচা দে বারোস এই মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের নীরবতায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরাশক্তি আমাদের নির্বাচনে একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে এবং আমাদের অর্থনীতিকে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করছে। ১৯৬২ সালের হস্তক্ষেপের সঙ্গে এর একটি বড় পার্থক্য তুলে ধরে তিনি বলেন, তৎকালীন সিআইএ অভিযানটি ছিল গোপন, কারণ তারা জানত জনমনে ক্ষোভ তৈরি হবে। কিন্তু আজ এই কাজ করা হচ্ছে একেবারেই প্রকাশ্য এবং অনেক বড় পরিসরে।
ইতিহাসবিদ জেমস এন গ্রিন ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং লুলার প্রচারণাকে বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টার সাথে ৬০-এর দশকের শুরুতে ওয়াশিংটনের গুলার্ত সরকারকে দুর্বল করার পদক্ষেপের মিল খুঁজে পান, যখন বিরোধীদের অর্থায়ন ও ঋণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি মনে করেন, ট্রাম্প ও রুবিওর এই অভিযানের পেছনে দুটি কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলের লুলার সরকারকে দুর্বল করা, যাতে তারা কিউবার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে না পারে। দ্বিতীয়ত, পুরো লাতিন আমেরিকায় বামপন্থী শক্তিগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে ট্রাম্পপন্থী ডানপন্থী নেতাদের ক্ষমতায় আনা। ২০২৩ সাল থেকে আর্জেন্টিনা, চিলি, কোস্টা রিকা এবং কলম্বিয়ায় একের পর এক উগ্র ডানপন্থী পপুলিস্টরা ক্ষমতায় এসেছে, যা এই অঞ্চলে 'কমলা তরঙ্গ' (অরেঞ্জ ওয়েভ) নামে পরিচিতি পেয়েছে।
৩৮ বছর বয়সী রাজনৈতিক কর্মী চিকো রুবেনস পাইভা আশঙ্কা করছেন, এই মার্কিন হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখা। তার দাদা রুবেনস পাইভা ১৯৬৩ সালে মার্কিন হস্তক্ষেপের তদন্ত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে ক্ষমতা দখলকারী মার্কিন সমর্থিত সামরিক স্বৈরশাসনের হাতে নিহত হন। পাইভা বিশ্বাস করেন, ভেনিজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের চেষ্টার মতোই এই হস্তক্ষেপের লক্ষ্য হলো ২০২৮ সাল নাগাদ এই অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য সুদৃঢ় করা। পাইভা সতর্ক করে বলেন, নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে মার্কিন সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোও অ্যালগরিদম পরিবর্তনের মাধ্যমে বলসোনারোকে সুবিধা দিতে পারে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হস্তক্ষেপের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে একে একটি 'ভিত্তিহীন মিথ্যা' বলে দাবি করেছে।

