মার্কিন পণ্যে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর, শুরু হলো পুরোদস্তুর বাণিজ্য যুদ্ধ

৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ এক নতুন ধাপে পৌঁছাল। গত মাসে দুই দেশের মধ্যকার আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডা থেকে আমদানিকৃত প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।

আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এডওয়ার্ড জোনসের সিনিয়র গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিস্ট অ্যাঞ্জেলো কুরকাফাস জানান, এই নতুন শুল্ক কানাডার অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও তা সামাল দেওয়া সম্ভব। তবে এর প্রভাব বিভিন্ন প্রদেশ ও খাতে ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়বে। অন্যদিকে, এই পাল্টা শুল্কের কারণে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের পকেটে সরাসরি বড় কোনো প্রভাব পড়বে না, কারণ এই কর পরিশোধ করতে হবে কানাডাভিত্তিক আমদানিকারকদের। তবে সাইমন-কুচার-এর কনজিউমার সেক্টরের প্রধান শিখা জৈন বলেন, যেসব মার্কিন উৎপাদক নিয়মিত কানাডায় পণ্য রপ্তানি করেন, তারা বড় ধরনের চাহিদার সংকটে পড়বেন। ফলে তাদের বিকল্প বাজার বা অভ্যন্তরীণ ক্রেতা খোঁজার জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল নতুন করে সাজাতে হবে।

ডাচ ব্যাংক আইএনজি-র গবেষণা প্রধান প্যাড্রিক গার্ভে বলেন, মার্কিন গ্রাহকদের জন্য আসল চিন্তার বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের পরিশোধ করা শুল্ক। মার্কিন আমদানিকারকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা এই বাড়তি খরচের বোঝা নিজেরা বহন করবেন নাকি পণ্যের দাম বাড়িয়ে তা ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেবেন। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, দুই দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরোক্ষভাবে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। যেমন, কোনো কানাডীয় প্রস্তুতকারক যদি মার্কিন কাঁচামাল আমদানির জন্য বাড়তি শুল্ক দেয় এবং পরে সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য আবার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, তবে দ্বিগুণ শুল্কের কারণে পণ্যটির দাম অনেক বেড়ে যাবে। এই বাণিজ্য ব্যবস্থার অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণ হবে।

কানাডার এই পাল্টা শুল্কের তালিকায় রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, কৃষি সরঞ্জাম, মণ্ড ও কাগজ, প্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিক্সসহ শত শত মার্কিন পণ্য। এছাড়া মার্কিন হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করেছে ওটাওয়া। নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে, মার্কিন দুধ, টি-শার্ট, সুগন্ধি, স্মার্টফোন এবং কিছু আসবাবপত্রের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। পনির, টয়লেট পেপার, কার্পেট এবং কিছু গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ওপর ২৫ শতাংশ এবং মার্কিন এয়ার কন্ডিশনার ও যন্ত্রাংশের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

অপরদিকে, কানাডার ওপর মার্কিন শুল্কের মূল লক্ষ্য দেশটির গাড়ি, অ্যালকোহল এবং দুগ্ধজাত শিল্প। তবে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের ১৮ পৃষ্ঠার দীর্ঘ শুল্ক তালিকায় রয়েছে খেলনা, হকি সরঞ্জাম, রুপা, ক্যামেরা, মধু, ফুল, গলফ খেলার সামগ্রী, ভিডিও গেম কনসোল, সোনার নেকলেস এবং পোশাক। শিখা জৈন জানান, মার্কিন ক্রেতারা দেশীয় পণ্য কিনে শুল্ক এড়াতে পারলেও, যারা কানাডীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের আগামী মাসগুলোতে বাড়তি দাম গুণতে হবে। এছাড়া মার্কিন আবাসন নির্মাতারা কানাডা থেকে বাড়ি তৈরির সামগ্রী আমদানি করায় যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বাড়ি নির্মাণের খরচ আরও বেড়ে যেতে পারে।

কানাডার এই শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডীয় বিমান প্রস্তুতকারক কোম্পানি বোম্বার্ডিয়ারকে মার্কিন বাজারে নিষিদ্ধ করার হুমকি দেন, যদি না তারা তাদের উৎপাদন কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করে। ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, তাদের আয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তারা মার্কিন ক্রেতা, কোম্পানি, বিমানবন্দর ও সেবার ওপর ভর করে বেঁচে আছে; অথচ কানাডা আমাদের দারুণ সব মার্কিন ব্যাংক ও কোম্পানিকে বাধা দিচ্ছে। সেই দিন শেষ! তারা আমাদের বাজার চাইলে এখানেই উৎপাদন করতে হবে, আমেরিকাকে পিগি ব্যাংক ভাবা বন্ধ করতে হবে।

পাল্টা হুমকি দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও। গত আগস্টে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে তাদের জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। এমনটি হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেলের সরবরাহ কমে যাবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যাবে। তবে শিখা জৈন মনে করেন, কানাডার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় গ্রাহককে রাতারাতি পরিবর্তন করা কঠিন হবে। প্যাড্রিক গার্ভে এটিকে একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে বলেন, এটি মার্কিন অবকাঠামোর ক্ষতি করার পাশাপাশি কানাডাকে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তবে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হবে না বলেই তার প্রত্যাশা।

এই বাণিজ্য যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কারও জেতার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। গার্ভে বলেন, এটি আসলে কে কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার লড়াই। বিগত এক দশকে কানাডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় এই যুদ্ধ কানাডার জন্যই বেশি ক্ষতিকর হতে পারে, তবে দুই দেশই একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। গত আগস্টে কার্নি বলেছিলেন, কানাডাই আমেরিকার প্রবৃদ্ধির জ্বালানি যোগায়, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অপরিশোধিত তেল আমদানির বড় অংশই আসে কানাডা থেকে। ২০২৫ সালে কানাডার মোট রপ্তানির ৭২.৫ শতাংশ এবং জিডিপির ১৭ শতাংশই ছিল মার্কিন বাজার কেন্দ্রিক। কোস্টার গ্রুপের কানাডার প্রধান অর্থনীতিবিদ মারিও লেফেভ্রে বলেন, দুই দেশের অর্থনীতি এতটাই নিবিড়ভাবে জড়িত যে এই দ্বন্দ্ব অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তবে এর সমাধানের পথটি হবে অত্যন্ত অস্থির, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত।

শিরোনাম :
জ্বালানি সাশ্রয়ের নিয়ম শিথিলের উদ্যোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ল টম ক্রুজের নতুন সিনেমা ডিগার নিউজিল্যান্ডের ক্যাজুয়াল চুক্তিতে মাইকেল ব্রেসওয়েল, দলে নতুন মুখ নিক কেলি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মন জয়ে ফ্লোরিডার গভর্নর প্রার্থী ডোনাল্ডস জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান প্রশান্ত মহাসাগরীয় নেতাদের ৩১ বছরেও আবাসন সংকটে পূর্বাচল, ভোগান্তিতে প্লট মালিকরা জাতিসংঘের উদ্বেগ উপেক্ষা করে ১,৫০০ নাগরিককে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া ইকুইফ্যাক্সের ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা: ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন গ্রাহকরা সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে মার্কিন বোমারু বিমান প্রত্যাহার ব্রাজিলে প্রথম পর্বে কেউ পায়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতা, লুলার মুখোমুখি ফ্লাভিও বলসোনারো জ্বালানি সাশ্রয়ের নিয়ম শিথিলের উদ্যোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়ল টম ক্রুজের নতুন সিনেমা ডিগার নিউজিল্যান্ডের ক্যাজুয়াল চুক্তিতে মাইকেল ব্রেসওয়েল, দলে নতুন মুখ নিক কেলি কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মন জয়ে ফ্লোরিডার গভর্নর প্রার্থী ডোনাল্ডস জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান প্রশান্ত মহাসাগরীয় নেতাদের ৩১ বছরেও আবাসন সংকটে পূর্বাচল, ভোগান্তিতে প্লট মালিকরা জাতিসংঘের উদ্বেগ উপেক্ষা করে ১,৫০০ নাগরিককে ফেরত পাঠাল মালয়েশিয়া ইকুইফ্যাক্সের ১০০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা: ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন গ্রাহকরা সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে মার্কিন বোমারু বিমান প্রত্যাহার ব্রাজিলে প্রথম পর্বে কেউ পায়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতা, লুলার মুখোমুখি ফ্লাভিও বলসোনারো