কয়েক দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতি মানুষের অনাগ্রহ বাড়লেও, সম্প্রতি সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যাথলিক গির্জাগুলোতে তরুণদের আগমন ও ধর্মান্তরের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ‘জেন জি’ বা নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ক্যাথলিক ধর্মের প্রতি এক ধরনের নীরব আকর্ষণ তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) পাশে অবস্থিত আওয়ার সেভিয়ার প্যারিশে সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী আলিসিয়া মার্টিনেজ। প্রোটেস্ট্যান্ট পারিবারিক ঐতিহ্য থেকে আসা আলিসিয়া জানান, এক বছরেরও বেশি সময় আগে তিনি নিজের হৃদয়ে ক্যাথলিক ধর্মের প্রতি এক তীব্র টান অনুভব করেন। চলতি বছর তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যাথলিক গির্জার আনুষ্ঠানিক দীক্ষা প্রক্রিয়া ‘অর্ডার অব ক্রিশ্চিয়ান ইনিশিয়েশন অব অ্যাডাল্টস’ (ওসিআইএ) সম্পন্ন করেছেন। মহানগরের একাকীত্ব এবং বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যে ম্যাথুর গসপেল বা সুসমাচার তাকে এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করেছে বলে তিনি জানান।
আলিসিয়ার মতো এমন ধর্মান্তরের চিত্র এখন পুরো অঞ্চল জুড়েই দেখা যাচ্ছে। গত এপ্রিলে আর্চডায়োসিস অব লস অ্যাঞ্জেলেস জানিয়েছে, রেকর্ড ৮,৫৯৮ জন মানুষ ব্যাপ্টাইজড বা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাথলিক ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আর্চডায়োসিসের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। মহামারি পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্যাথলিক গির্জায় যোগদানের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ার সেভিয়ার প্যারিশের যাজক ফাদার ম্যাট হুইলার জানান, চলতি বছর তাদের গির্জায় রেকর্ড ১৬ জন ব্যাপ্টাইজড হয়েছেন। এছাড়া তাদের ওসিআইএ প্রোগ্রামে নিবন্ধিত হয়েছেন ৬৯ জন, যা গত বছরের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি। গির্জায় প্রার্থনা সভায় মানুষের উপস্থিতি এতটাই বেড়েছে যে মাঝে মাঝে উপাসনাকারীদের মূল হলের বাইরে লাইভ স্ট্রিম দেখার জন্য পাঠাতে হচ্ছে। ফাদার হুইলার বলেন, “তরুণদের কেউ জোর করে এখানে আনছে না, তারা স্বেচ্ছায় আসছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ২০ বছর বয়সী ক্যাথরিন গ্ল্যাভিনের গল্পটাও একই রকম। দীর্ঘদিন নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী বা ‘অ্যাগনস্টিক’ ভাবা ইউসি সান্টা বারবারার এই শিক্ষার্থী গত এপ্রিলে সেন্ট মার্কস ইউনিভার্সিটি প্যারিশে ব্যাপ্টাইজড হন। গ্ল্যাভিন বলেন, “বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অবিচার ও বিভাজনের এই অন্ধকার সময়ে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আলোর সন্ধান করছে।” সেন্ট মার্কস গির্জার ফাদার রায়ান থর্নটন জানান, এবার তাদের গির্জায় ৫৬ জনের সবচেয়ে বড় দল দীক্ষা নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ইনস্টাগ্রাম উপযোগী’ কৃত্রিম জীবনযাত্রার অসারতা বুঝতে পেরেই তরুণরা ধর্মের গভীরতার দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করেন তিনি।
অবশ্য সমাজবিজ্ঞানীরা এখনই একে স্থায়ী ধর্মীয় পুনর্জাগরণ বলতে নারাজ। ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশেল ডিলন বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন একটি চলমান বিষয়। তবে দীর্ঘদিনের পতনের পর এটি অবশ্যই একটি কৌতূহলোদ্দীপক মোড়। সমাজবিজ্ঞানী ও ধর্মতত্ত্ববিদ মরিন ডে মনে করেন, গির্জার জীবনে এই নতুনদের দীর্ঘমেয়াদী অংশগ্রহণই কেবল নিশ্চিত করতে পারবে যে এটি কোনো স্থায়ী পরিবর্তন কি না। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে এই পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।
৫০ বছর বয়সী জন সেবালোস এই বছর আওয়ার সেভিয়ায়ের ওসিআইএ প্রোগ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য ছিলেন। শৈশবে ক্যাথলিক হিসেবে বড় হলেও একসময় তিনি গির্জায় যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেবালোস বলেন, আগে পাপ ও নরকের ভয় দেখিয়ে ধর্ম প্রচার করা হতো, কিন্তু বর্তমানের বার্তা অনেক বেশি ভালোবাসাময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। ১৯ বছর বয়সী এইডান ফ্রেয়ারও জানান, গির্জার এই তরুণ প্রাণোচ্ছল পরিবেশই তাকে প্রতিনিয়ত এখানে টেনে আনে।

