যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি অঙ্গরাজ্যের অন্তত ১৯ জন পুলিশ ও শেরিফ কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফ্লক সেফটি (Flock Safety) কোম্পানির লাইসেন্স প্লেট রিডার ক্যামেরার বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বেআইনিভাবে নাগরিকদের গাড়ি ট্র্যাক করার অভিযোগ উঠেছে। গত দুই মাসে এই অপব্যবহারের দায়ে অনেককে গ্রেপ্তার, বরখাস্ত, প্রশাসনিক ছুটিতে পাঠানো বা তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অনিয়ম কোনো পুলিশ সুপার বা বিভাগীয় নজরদারিতে ধরা পড়েনি, বরং তা উন্মোচন করেছেন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইউএসএ টুডে (USA TODAY)-র সাংবাদিকরা।
তদন্তে উঠে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জর্জিয়ার ডালাস শহরের ৯১১ জরুরি সেবা বিভাগের পরিচালক হেইডি টেলর তার বিচ্ছেদ হওয়া স্বামী বিলি টেলর এবং তার নতুন প্রেমিকা লিয়ান্ড্রা হিগেনবটমের গাড়ি আড়াই হাজারেরও বেশি বার ট্র্যাক করেছেন। এই অভিযোগে গত ১২ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। হেইডি টেলরের সাবেক স্বামী বিলি জানান, হেইডি প্রায়ই তাদের না জানিয়ে বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল ও প্রত্যন্ত এলাকায় হাজির হতেন এবং তাদের ওপর নজর রাখতেন। হেইডি টেলরের বিরুদ্ধে লাইসেন্স প্লেট রিডার অপব্যবহারের দুটি অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।
ফ্লোরিডার সারাসোটাতে কোরি ওয়েটার্স নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা তার সাবেক প্রেমিকার গাড়ি দুই মাসে অন্তত ৩৩৫ বার ট্র্যাক করার পর তাকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে, টেক্সাসের লাফকিন পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা জ্যাকারি ক্লাইনকে সাতটি লাইসেন্স প্লেট বারবার ট্র্যাক করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি প্লেট তিনি ৩,৪০০ বারের বেশি ট্র্যাক করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে অন্তত ১০০টি গুরুতর অপরাধের (ফেলোনি) অভিযোগ আনা হয়েছে। এই ঘটনার পর লাফকিন পুলিশ বিভাগ তাদের পুরো বিভাগে ফ্লক ক্যামেরার ব্যবহার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
ইউএসএ টুডের সাংবাদিকরা এই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়োগকারী সংস্থাকে সতর্ক করার পরই কেবল তারা ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, দেশজুড়ে স্বয়ংক্রিয় লাইসেন্স প্লেট রিডার প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়লেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তাদের নিজস্ব কর্মীদের ওপর নজরদারিতে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। ফলে নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার দায়িত্ব এখন সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের কাঁধে এসে পড়েছে।
ইউএসএ টুডের এই বিশ্লেষণটি সম্ভব হয়েছিল কারণ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ফ্লক সেফটির গ্রাহক সংস্থাগুলো একটি মাসিক অডিট লগ বা বিবরণী দেখতে পেত। সেখানে কোন কর্মকর্তা কোন লাইসেন্স প্লেট অনুসন্ধান করেছেন এবং তার কারণ কী ছিল, তা স্পষ্ট উল্লেখ থাকত। কিন্তু প্রযুক্তিটি নিয়ে জনমনে সমালোচনা ও বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ফ্লক তাদের সফটওয়্যার পরিবর্তন করে। নতুন সিস্টেমে কর্মকর্তাদের নাম বা আদ্যক্ষর, লাইসেন্স প্লেটের নম্বর এবং অনুসন্ধানের কারণগুলো কালো কালিতে ঢেকে দেওয়া (ব্ল্যাক আউট) শুরু হয়। ফলে ভবিষ্যতে এই ধরণের বড় আকারের অপব্যবহার খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ডিজিটাল অধিকার বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ‘ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন’-এর তদন্ত বিষয়ক পরিচালক ডেভ মাস ফ্লকের এই সিদ্ধান্তকে স্বচ্ছতা এবং বাইরের কর্মকর্তাদের অপব্যবহার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একটি ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ফ্লকের প্রধান যোগাযোগ কর্মকর্তা জোশুয়া থমাস এক বছর আগে এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "পুলিশের ওপর নজরদারি করা ফ্লকের কাজ নয়।"
ফ্লকের জনসংযোগ ব্যবস্থাপক প্যারিস লিউবেল এক ইমেইল বিবৃতিতে জানিয়েছেন, "আমাদের সিস্টেমের যেকোনো অপব্যবহার সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং যারা এটি করবে তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।" তিনি দাবি করেন, আন্ডারকভার বা ছদ্মবেশী কর্মকর্তাদের পরিচয় ও তদন্তের স্বার্থ রক্ষা করতেই অডিট লগ থেকে তথ্য গোপন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ইউএসএ টুডে এর সুনির্দিষ্ট উদাহরণ চাইলে কোম্পানিটি কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারি মাসে ফ্লক একটি নতুন ‘অডিট অ্যাসিস্ট্যান্স’ টুল চালু করেছে, যা অস্বাভাবিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অ্যাক্সেস বন্ধ করে দেবে। তবে এই ফিচারটি শুধুমাত্র ২০২৬ সালের জানুয়ারি বা তার পরের অনুসন্ধানগুলোর ক্ষেত্রে কাজ করে এবং ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এটি সব গ্রাহকের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে।
জর্জিয়ার কভিংটনে এই নতুন টুলের সাহায্যে পুলিশ জানতে পারে যে মাইকেল ক্যান্টি নামের এক ডিটেকটিভ গত জানুয়ারি থেকে তার এক নারী সহকর্মীর গাড়ি ৪১ বার ট্র্যাক করেছেন। এর জেরে তাকে বরখাস্ত করে তদন্তের জন্য জর্জিয়া ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু ইউএসএ টুডের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্যান্টির নজরদারি ছিল আরও ভয়াবহ। তিনি ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ওই নারীর গাড়ি ২,৮৯০ বার ট্র্যাক করেছিলেন, যা ওই নারী জানতেনই না। ক্যান্টির বিরুদ্ধে গত ২৭ আগস্ট সরকারি কর্মকর্তার শপথ ভঙ্গসহ পাঁচটি অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
জর্জিয়ার চেরোকি কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় গত ১৯ আগস্ট ডেপুটি জেরি শেলহাউসকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করেছে, যিনি একটি লাইসেন্স প্লেট অন্তত ৮৪০ বার অনুসন্ধান করেছিলেন। এছাড়া মিসৌরির সেন্ট চার্লস কাউন্টি পুলিশ বিভাগ তাদের এক কর্মীকে বরখাস্ত করে ফ্লক ক্যামেরার ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। টেক্সাসের হ্যারিস কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় তিন ডেপুটি কর্মকর্তার ফ্লক অ্যাক্সেস স্থগিত করেছে। ইউএসএ টুডের অনুসন্ধানের পর হিউস্টন পুলিশ বিভাগ, মিশিগানের ইস্টপয়েন্ট পুলিশ বিভাগসহ আরও বেশ কয়েকটি সংস্থা তাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা প্রশাসনিক তদন্ত শুরু করেছে।
২০১৭ সালে জর্জিয়া টেকের প্রাক্তন শিক্ষার্থী গ্যারেট ল্যাংলি, পেজ টড ও ম্যাট ফিউরি অপরাধ দমনের স্বপ্ন নিয়ে ফ্লক সেফটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিটির ১ লাখেরও বেশি ক্যামেরা বসানো রয়েছে এবং এর বাজার মূল্য প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার। কোম্পানিটির দাবি, তারা বছরে প্রায় ১০ লাখ অপরাধের সমাধান করতে সাহায্য করে। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের হাতে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাকে বড় ধরণের হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।

