চালের দানার সমান আকৃতির নিয়ন সবুজ রঙের একটি সামুদ্রিক স্লাগ ‘লিফ শীপ’ বিশ্বব্যাপী পাঠকদের ভোটে ২০২৬ সালের সেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণী (ইনভার্টেব্রেট অব দ্য ইয়ার) হিসেবে মুকুট জয় করেছে। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও কিউট চেহারার এই প্রাণীটি জনপ্রিয় ‘পোকেমন’ কার্টুনের একটি চরিত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবেও পরিচিত। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে আয়োজিত এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ পাঠক তাদের পছন্দের প্রাণীকে ভোট দেন।
বিজয়ী প্রাণীর নাম ঘোষণা করে বিশিষ্ট সম্প্রচারক ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ক্রিস প্যাকহ্যাম বলেন, “এটি অত্যন্ত সুন্দর এবং একই সঙ্গে ভীষণ চতুর একটি প্রাণী। এটি যে শৈবাল বা অ্যালগি খেয়ে বেঁচে থাকে, তা থেকে সালোকসংশ্লেষণকারী উপাদান সংগ্রহ করে নিজের শরীরে এক ধরণের সৌর প্যানেল তৈরি করে নেয়।” অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, “আমরা যেভাবে জীবনকে চিনি, তা সম্পূর্ণভাবে এই অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ওপর নির্ভরশীল।”
এই প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে ডাইনোসর আমলের চেয়েও প্রাচীন এবং নীল রক্তের অধিকারী বিশেষ এক ধরণের সন্ধিপদী প্রাণী ‘হর্সশু ক্র্যাব’ বা রাজকাঁকড়া। এর ঠিক পরেই চতুর্থ অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে ‘কমন উডলাউস’। সাধারণত এই প্রতিযোগিতায় কেঁচো বা কৃমিজাতীয় প্রাণীরা বেশ ভালো ভোট পেলেও, এবারের ১০টি প্রাণীর সংক্ষিপ্ত তালিকায় একদম শেষ অবস্থানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম প্রাণী ‘বুটলেস ওয়ার্ম’।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, পৃথিবীতে অন্তত ১৭ লাখ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী রয়েছে, যা মোট প্রাণীকুলের প্রায় ৯৭ শতাংশ। এছাড়াও আরও লাখ লাখ প্রজাতি এখনও বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও নামকরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিশাল প্রাণীকুলকে অবহেলা ও অবজ্ঞার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং তাদের অবদানকে উদযাপন করতে তিন বছর আগে এই প্রতিযোগিতার সূচনা করা হয়। বন্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীরা যদি বিনামূল্যে ফসল পরাগায়ন, পানি পরিশোধন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, দূষণ পরিষ্কার এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো না করত, তবে পৃথিবীতে মানুষের জীবন দ্রুতই বিপন্ন হয়ে পড়ত।
এ বছর বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে শিশুসহ গার্ডিয়ানের হাজার হাজার পাঠক অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে ১০টি প্রাণীর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয়। দুই সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজনে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। এর মধ্যে এরিকা ম্যাকঅ্যালিস্টার মাছির গুরুত্ব ও সৌন্দর্য নিয়ে আলোচনা করেন, বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী দারা ওজো ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির আনন্দ শেয়ার করেন এবং কনর বাটলার মনে করিয়ে দেন যে প্রাকৃতিক বিশ্বে মানুষের বাইরে ‘অন্য কিছু’ বলতে কিছু নেই, আমরা সবাই একই জীবন ব্যবস্থার অংশ।
জাপান, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের গ্রীষ্মমন্ডলীয় জলভাগে বাস করা এই ‘লিফ শীপ’ (বৈজ্ঞানিক নাম: কোস্টাসিয়েলা কুরোশিমায়ে) ১৯৯৩ সালে প্রথম বিজ্ঞানীদের নজরে আসে এবং এর নামকরণ করা হয়। এরপর থেকে পানির নিচের আধুনিক ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির অগ্রগতির কল্যাণে মানুষের কাছে এর কিউট চেহারাটি উন্মোচিত হতে শুরু করে এবং প্রাণীটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

