বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান, ইউক্রেন ও ফিলিস্তিন সংকট—চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে তার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডা এগিয়ে নিতে এক সুযোগ হিসেবে দেখছেন। প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা ৭৩ বছর বয়সী এই চীনা নেতা এখন একাধারে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার এই কৌশল বিশ্বব্যবস্থা এবং চীনের ভেতরে থাকা প্রায় ১২৫ মিলিয়ন সংখ্যালঘু মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো, যাদের মধ্যে তিব্বতি, মঙ্গোলীয় ও উইঘুররা অন্তর্ভুক্ত। শি জিনপিংয়ের নতুন 'জাতিগত ঐক্য' আইনটি এই সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিলুপ্ত করে এক ধরনের বাধ্যতামূলক আত্তীকরণ বা 'সিনিকাইজেশন' নীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শি জিনপিংয়ের দাবি, এই নীতি জাতীয় ঐক্য বাড়াবে এবং মান্দারিন ভাষার ব্যবহার বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। কিন্তু ভুক্তভোগীরা এটিকে তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা মুছে ফেলার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
চীনের এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতা লক্ষণীয়। হংকংয়ে গণতন্ত্রের অবসান, জিমি লাইয়ের মতো গণতন্ত্রপন্থীদের বিচার কিংবা স্বাধীন খ্রিস্টান চার্চের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর পরও পশ্চিমা বিশ্বের চীন নীতি এক ধরনের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ও দুর্বল। বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দোহাই দিয়ে মানবাধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো কার্যকর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
শি জিনপিংয়ের লক্ষ্য এখন সুনির্দিষ্ট—চীনকে বিশ্বের প্রধান শক্তিতে পরিণত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বিতীয় অবস্থানে নামিয়ে আনা। তাইওয়ানের দখল ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে একক আধিপত্য তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই আক্রমণাত্মক। ইরানকে ৪০০টি কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার পরিকল্পনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করা তার এই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।
২১তম পার্টি কংগ্রেসের প্রাক্কালে ২০২৭ সাল শি জিনপিংয়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর হতে যাচ্ছে। ট্রাম্পের পোস্ট-১৯৪৫ বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে ফেলার প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের অবস্থান পোক্ত করছেন। আগামী মাসে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে তার আসন্ন বৈঠকটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রতিযোগিতা নিয়ে, যেখানে চীন ইতিমধ্যে ২৮টি দেশের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। এছাড়া, চীনের অভ্যন্তরীণ নীতিতে ৫৫টি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ।
তবে সবকিছুর পরেও শি জিনপিংয়ের এই একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যর্থতা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ভবিষ্যতে তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ব যখন অন্য সংকটে ব্যস্ত, তখন শি জিনপিংয়ের এই ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যবাদী আচরণ যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ বন্ধ করে দিচ্ছে, তা নিয়ে সতর্ক থাকার সময় এসেছে।

