ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের আকস্মিক অগ্রযাত্রার মুখে ইয়েমেনের রেড সি উপকূল থেকে ১ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘাতের এই নতুন ঢেউ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর নতুন হুমকি তৈরি করেছে। ইয়েমেনের এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে এর আগে আনুমানিক ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবিক কার্যালয় জানিয়েছে, এই সহিংসতায় এখন পর্যন্ত আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হয়েছেন। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুতদের মধ্যে ৫৭ হাজারেরও বেশি শিশু রয়েছে। বাস্তুচ্যুতদের দুর্দশা বর্ণনাতীত; যেমন থাবেত নামের এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তারা ৫ কিলোমিটার (৩ মাইল) পথ হেঁটে পাড়ি দেওয়ার পর পাহাড়ি রাস্তায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার (৩৭ মাইল) পথ গাড়িতে ভ্রমণ করেছেন। থাবেত তার বোনকে নিয়েও উদ্বিগ্ন, যিনি ডায়াবেটিসের ওষুধ কিনতে পারছেন না। তার ৮ এবং ১৩ বছর বয়সী দুই মেয়ের রক্তস্বল্পতার সমস্যা রয়েছে।
ইউনিসেফের ইয়েমেন প্রতিনিধি ওবিয়া আচিয়াং জানিয়েছেন, ইয়েমেনে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে দ্রুত ও অস্থির বাস্তুচ্যুতির ঘটনা। পরিবারগুলো খুব সামান্য সতর্কবার্তায় বা রাতে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে এবং তারা সাথে সামান্য কিছু জিনিস নিতে পারছে।
ইশরাক আবদেল জেলিল এবং তার স্বামী এমনই এক দম্পতি, যারা পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে পার্শ্ববর্তী শহর তায়েজে আশ্রয় নিয়েছেন। চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা ইশরাক জানিয়েছেন, এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় তিনি প্রচণ্ড আতঙ্কে ছিলেন। তায়েজে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক জানিয়েছেন, গর্ভের সন্তান নড়াচড়া করেছে, যা তার জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বর্তমানে তারা আত্মীয়ের বাসায় গাদাগাদি করে থাকছেন এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাবে ভুগছেন।
মানবিক সংস্থা ‘প্রসপার গ্লোবাল’-এর মিলেনা মুর জানিয়েছেন, অনেক মানুষ ১৬ ঘণ্টারও বেশি সময় হেঁটে তায়েজে পৌঁছাচ্ছেন। তাদের অনেকেই তৃষ্ণার্ত, ক্লান্ত এবং শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির লক্ষণ স্পষ্ট। কেয়ার (CARE) নামক সাহায্য সংস্থার ইমান আবদুল্লাহি জানিয়েছেন, সেখানে খাদ্য, প্রসূতি স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা সামগ্রী এবং মানসিক সহায়তার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে। বাস্তুচ্যুত অনেকেরই বেঁচে থাকার মতো নূন্যতম কোনো ব্যবস্থা নেই। নাশওয়ান আহমেদ সাইদ নামে একজন জানিয়েছেন, যুদ্ধের শুরু থেকে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তাকে বাস্তুচ্যুত হতে হলো।
২০১৪ সালে হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখল করলে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থনে হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গত জুলাই মাসে হুথিরা নতুন করে আক্রমণ শুরু করে। বিদ্রোহীরা জানিয়েছে, এই আক্রমণ তারা সৌদি আরবের অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চালাচ্ছে। বর্তমানে সৌদি-সমর্থিত সরকার বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, আর সাধারণ ইয়েমেনি নাগরিকরা এই সংঘাতের বলি হচ্ছেন।

