মৃত্যুর আগে হাসপাতাল থেকে ভিডিও বার্তায় যা বলেছিলেন শাফিন

সব প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে সংগীতপ্রেমীরা জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের প্রিয় শিল্পীর গান শুনবেন বলে। একই মঞ্চে গাওয়ার কথা ছিল জনপ্রিয় শিল্পী সামিনা চৌধুরীরও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছন্দপতন ঘটলো। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ, বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শাফিন আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বদলে গেল পুরো আয়োজন।

সেদিন গানের বদলে মঞ্চের বিশাল এলইডি পর্দায় ভেসে উঠলো শাফিন আহমেদের মুখ। হাসপাতালের বিছানা থেকে ভক্ত ও আয়োজকদের উদ্দেশ্যে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন:

“আজ কনসার্টে আপনাদের সাথে দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিক কিছু জটিলতার কারণে হঠাৎ মেডিকেল চেকআপে আসতে হলো। চিকিৎসকদের নির্দেশে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে, তাই হাসপাতালেই ভর্তি হতে হলো—যা আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন। আজকের মতো হয়তো আর দেখা হচ্ছে না। আমার সব শ্রোতা, ভক্ত এবং আয়োজকদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে আশা করি, আগামীতে নিশ্চয়ই আপনাদের সাথে দেখা হবে। ধন্যবাদ।”

নিশ্চয়ই দেখা হবে—ভক্তদের দেওয়া সেই কথা আর রাখতে পারেননি তিনি। ভিডিও বার্তাটি দেওয়ার পরই ২০ জুলাই রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে এবং তিনি গুরুতর হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হলেও চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি চলে যান না-ফেরার দেশে। গত বৃহস্পতিবার পেরিয়ে গেল এই সুরের রাজপুত্রের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।

সুরের উত্তরাধিকার ও ‘মাইলস’ অধ্যায়

১৯৬১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শাফিন আহমেদ। তাঁর মা কিংবদন্তি নজরুলসংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম এবং বাবা বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ কমল দাশগুপ্ত। পারিবারিক আবহেই ছোটবেলা থেকে গানে হাতেখড়ি—বাবার কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত আর মায়ের কাছে শিখেছেন নজরুলসংগীত।

পরবর্তী সময়ে বড় ভাই হামিন আহমেদের সাথে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করার সূত্রে পাশ্চাত্য সংগীতে অনুপ্রাণিত হন তিনি। দেশে ফিরে গড়ে তোলেন ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যান্ড ‘মাইলস’। দলটির বেজ গিটার সামলানোর পাশাপাশি মাইলসের প্রায় ৯০ ভাগ জনপ্রিয় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শাফিন নিজেই। ‘আজ জন্মদিন তোমার’, ‘চাঁদ তারা সূর্য’, ‘জ্বালা জ্বালা অন্তরে’, ‘ফিরিয়ে দাও হারানো প্রেম’, ‘ফিরে এলে না’ কিংবা ‘হ্যালো ঢাকা’র মতো কালজয়ী গানগুলো তাঁর কণ্ঠেই অমর হয়ে আছে।

বাবার সুর করা গান নিয়ে একক অ্যালবাম করার পাশাপাশি জীবনের শেষভাগে বাবা-মায়ের ঐতিহ্য ধরে রেখে ও নিজের একক কাজ নিয়ে সরব ছিলেন তিনি। মাঝখানে কিছুদিন রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী হিসেবেও আলোচনায় এসেছিলেন এই সংগীত তারকা।

সময় গড়ালেও শাফিন আহমেদের সেই দরদী কণ্ঠ আর অসাধারণ সুরের সৃষ্টিগুলো বেঁচে থাকবে কোটি ভক্তের হৃদয়ে।