
কাগজপত্রের ঝামেলা ও ব্যাংকের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রেমিট্যান্স সংগ্রহের প্রথাগত চিত্র বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশে। রেগুলেটেড ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবাসীদের অর্জিত কষ্টার্জিত অর্থ এখন সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ওয়ালেটে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘পেমেন্ট সিস্টেমস রিপোর্ট’-এর তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানি ট্রান্সফার অপারেটরদের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ পেমেন্ট সিস্টেমের এপিআই-ভিত্তিক সংযোগের ফলে বৈপ্লবিক এ পরিবর্তন এসেছে। প্রবাসীরা এখন দূর থেকেই অর্থ পাঠাতে পারছেন এবং দেশে স্বজনরা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর না করেই মুহূর্তের মধ্যে তা গ্রহণ করতে পারছেন।
জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল ওয়ালেটের প্রসার
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের বরাতে জানা যায়, ২০২৬ সালের জুলাই মাসের প্রথম ২৯ দিনে প্রবাসী আয় এসেছে ২৭০ কোটি ৭ লাখ (২.৭০৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের (২২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার) তুলনায় ১৮.৯ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরের প্রথমার্ধে রেমিট্যান্স আসার ধারাটি ছিল ইতিবাচক। গত মার্চে ৩৭৫ কোটি, এপ্রিলে ৩১৩ কোটি, মে মাসে ৩৪৪ কোটি এবং জুনে ২৮২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। পাশাপাশি এমএফএস-এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই এমএফএস-এর মাধ্যমে এসেছে ২,১২৯ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে প্রায়৭১.৫ শতাংশ বেশি।
ডিজিটাল ব্যবস্থার সুবিধা ও বর্তমান বাস্তবতা
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী অর্থ পাঠানোর গড় খরচ ৬.৩৬ শতাংশ হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে তা ৪.৫৯ শতাংশে নেমে আসে। বাংলাদেশে বর্তমানে এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ২৫ কোটিতে পৌঁছেছে এবং এজেন্ট নেটওয়ার্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখে। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্যও ডিজিটাল রেমিট্যান্স বড় স্বস্তি হয়ে দেখা দিয়েছে।
তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি ‘ক্যাশলেস’ রেমিট্যান্স অর্থনীতিতে রূপ নেয়নি। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, এমএফএস লেনদেনের ৮৫ শতাংশের বেশি এখনও ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট বা ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেনে সীমাবদ্ধ, যা নির্দেশ করে অনেক গ্রাহকই ডিজিটাল ব্যালেন্স ব্যবহারের চেয়ে ক্যাশে রূপান্তর করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
হুন্ডি প্রতিরোধ ও রিজার্ভে অবদান
বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ সরকারি হিসাবে যুক্ত হয়, যা রিজার্ভ রক্ষা, ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এবং আমদানি ব্যয়ের বড় সংস্থান তৈরি করে। তবে বাজারভিত্তিক সঠিক বিনিময় হার, দ্রুততম সময়ে অর্থ হস্তান্তর এবং সাশ্রয়ী খরচ নিশ্চিত করতে পারলে প্রবাসীরা আপনাতেই হুন্ডি ছেড়ে বৈধ্য ও ডিজিটাল চ্যানেল বেছে নেবেন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকিং খাতের মতে, ডিজিটাল রেমিট্যান্সের পরবর্তী ধাপে সিস্টেমের নিরাপত্তা, সহজলভ্যতা ও ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মধ্যে ডেটা বিনিময়ের সুবিধা (Interoperability) বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেওয়াইসি (KYC), মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত কড়া নজরদারি বজায় রেখে সাধারণ প্রবাসীদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
